ইবিএলের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও দুই মেয়াদের চেয়ারম্যান ছিলেন দেশের ব্যবসা ও নৌপরিবহন খাতের প্রবীণ উদ্যোক্তা, এমজিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক চেয়ারম্যান এম গাজিউল হক আর নেই। সোমবার দুপুর ১টা ১০ মিনিটে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের ব্যবসায়ী অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এম গাজিউল হকের মৃত্যুর খবর এমজিএইচ গ্রুপের এক বিবৃতিতে জানানো হয়। তিনি স্ত্রী সুলতানা হক, ছেলে ইবিএলের বর্তমান চেয়ারম্যান আনিস আহমেদ, মেয়ে আনিলা হকসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। সোমবার বাদ মাগরিব রাজধানীর গুলশানের আজাদ মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। ১৯৩৪ সালে জন্ম নেওয়া এম গাজিউল হক বাংলাদেশের ব্যবসা ও নৌপরিবহন খাতের এমন এক প্রজন্মের উদ্যোক্তা, যারা স্বাধীনতার আগে কর্মজীবন শুরু করে পরে দেশের আধুনিক ব্যবসায়িক অবকাঠামো গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব তৈরিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে পড়াশোনা শেষে ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। একই বছর ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বার্ড অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭৬ সালে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি বার্ডস বাংলাদেশ লিমিটেড নামে পরিচালিত হতো। ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে উদ্যোক্তা হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর চট্টগ্রামভিত্তিক নৌপরিবহন প্রতিষ্ঠান অ্যাকোয়ামারিন লিমিটেডে অংশীদার হিসেবে যুক্ত হন এম গাজিউল হক। প্রায় এক দশক পর ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনভিত্তিক শিপিং প্রতিষ্ঠান মেয়ার্স্ক লাইনের যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলেন মেয়ার্স্ক বাংলাদেশ লিমিটেড। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক একটি বড় শিপিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নৌপরিবহনের পাশাপাশি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং, আমদানি-রপ্তানি, বিপণন, ব্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারত্বসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ছিল। দেশের নৌপরিবহন অবকাঠামোর বিকাশেও তিনি ভূমিকা রাখেন। বেসরকারি ব্যাংকিং খাতেও এম গাজিউল হকের দীর্ঘ সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৯৩ সালে তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন। পরে দীর্ঘ সময় ব্যাংকটির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই মেয়াদে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন তিনি—প্রথমবার ২০০০ থেকে ২০০৬ সাল এবং দ্বিতীয়বার ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত। ব্যাংকটির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ও করপোরেট সুশাসন জোরদারে তাঁর ভূমিকার কথা স্মরণ করেছে সংশ্লিষ্ট মহল। এমজিএইচ গ্রুপের সঙ্গেও তাঁর নাম গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯২ সালে তাঁর ছেলে আনিস আহমেদ এমজিএইচ গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। বাবার নামের আদ্যক্ষর থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে এটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক বহুজাতিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। বর্তমানে ২৬টি দেশে গ্রুপটির কার্যক্রম রয়েছে। লজিস্টিকস, এভিয়েশন, ভ্রমণ, ভোগ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, মোবিলিটি, আতিথেয়তা, অর্থায়ন ও বিমাসহ বিভিন্ন খাতে এর ব্যবসা বিস্তৃত। দীর্ঘ কর্মজীবনে এম গাজিউল হক ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে নৌপরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে তাঁর কাজ বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মৃত্যুতে ব্যবসায়ী সমাজে শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হকসহ ব্যবসায়ী অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। ৯২ বছরের কর্মময় জীবনের শেষে এম গাজিউল হকের মৃত্যু দেশের ব্যবসা, নৌপরিবহন ও ব্যাংকিং খাতে তাঁর দীর্ঘ অবদানের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাল।