চীনের বাজারে ‘বিস্ময়কর’ ব্যর্থতা বাংলাদেশের, কারণ কী?

| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

প্রায় ১৪১ কোটির বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ চীন। রপ্তানিকারক যে কোনো দেশের জন্যই বড় একটি বাজার। বাংলাদেশের জন্য এখানে রয়েছে শুল্কমুক্ত ট্যারিফ সুবিধা। তারপরও বিশাল এই বাজার ধরতে পুরোপুরি ব্যর্থ বাংলাদেশ। অথচ একই সুবিধা নিয়ে দেশটিতে দারুণ ব্যবসা করছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ৫০ বছর পার হয়েছে ইতোমধ্যে। এখন পর্যন্ত কোনো অর্থবছরেই এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমানে চীনে ৯৯ শতাংশ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। তারপরও এমন সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা ‘বিস্ময়কর’— মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৪২৮ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে চীনে রপ্তানি হয়েছে ৯ হাজার ১৫১ কোটি টাকা অর্থাৎ ৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। সেক্ষেত্রে রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশে এই অর্থবছরে আমদানি বেশি ছিল ৩২ ‍গুণ বেশি

বাংলাদেশ চীনের বাজার ধরতে না পারলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কিন্তু বেড়েছে। যা মূলত আমদানিকেন্দ্রিক। গত ১০ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে তিন গুণের বেশি। বাণিজ্যের ব্যবধানও বেড়েছে একই হারে। কারণ, চীন থেকে আমদানি বাড়লেও সেভাবে দেশটিতে রপ্তানি বাড়েনি বাংলাদেশের। দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশই আসে চীন থেকে। বিপরীতে মোট রপ্তানির মাত্র ১ থেকে দেড় শতাংশ যায় চীনে।

২০২২ সালে চীন তার বাজারে বাংলাদেশকে ৯৯ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু পণ্যের রপ্তানি কমে গেছে— বলছেন সংশ্লিষ্টরা। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে চীন থেকে দুই হাজার ১১২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৮ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশ ৩১ গুণ বেশি আমদানি করেছে চীন থেকে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ২৩২ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে ওই দেশে রপ্তানি করেছে ৮ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। সেক্ষেত্রে রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৯ ‍গুণের বেশি।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৯১ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৪২৮ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে চীনে রপ্তানি হয়েছে ৯ হাজার ১৫১ কোটি টাকা অর্থাৎ ৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। সেক্ষেত্রে রপ্তানির তুলনায় বাংলাদেশে এই অর্থবছরে আমদানি বেশি ছিল ৩২ ‍গুণ বেশি।

ভোক্তা কিংবা অর্থনৈতিক কল্যাণে আমদানি হতেই পারে। মূল বিষয় হলো— ওই সব দেশে কেন রপ্তানি বৃদ্ধি করতে পারছি না। আমাদের বিনিয়োগ আকর্ষণ করার দিকে নজর দিতে হবে। এটা শুধু চীনের জন্য প্রযোজ্য নয়, আমার তো অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আসছে নাসিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশ মূলত টেক্সটাইল, পোশাক, কৃষিপণ্য (যেমন- আম, কাঁঠাল), কাঁকড়া, কুঁচিয়া ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। পণ্যগুলোর চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরে রাখতে না পারার কারণে রপ্তানি কমে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চীনের বিশাল বাজার ধরতে না পারার পেছনে কিছু কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে— পণ্যের মান, মূল্য এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক না থাকা। শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও কিছু কিছু অশুল্ক বাধাও রপ্তানিকে প্রভাবিত করছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অশুল্কজনিত বাধা বড় বিষয় নয়। সাধারণত চীন বছরে ৩ হাজার বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানিকরে। তাই আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধি করতে হলে ওই পণ্যগুলোকে টার্গেট করে পরিকল্পনা করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে তারা বিশ্বে প্রথম স্থানে আছে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক। স্বাভাবিকভাবেই ওই পণ্য নিয়ে রপ্তানি বাজার ধরা কঠিন। আরেকটি বিষয়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বাংলাদেশে চীনের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) এনে রপ্তানি ও সরবরাহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করে চীনের বাজার ধরা। একই রকম শুল্ক সুবিধা নিয়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ওই পথেই সাফল্য দেখিয়েছে। 

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত