তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকটাই কমলেও অর্থনীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসন নিয়ে সরকারের সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। নির্বাচনী ইশতেহারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রগতি হলেও সব প্রতিশ্রুতির সুফল এখনো মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রায় দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করে। সেই সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নানা অস্থিরতার পর ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। সরকার গঠনের পরদিন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির কথা জানানো হয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনে গতি আনা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারের আলোচিত কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং ক্রীড়াবিদ, ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ উপাসনালয়ের দায়িত্বশীলদের ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার বিষয়টিই সামনে আসছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অস্থিরতার পর নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় মানুষের মধ্যে অপেক্ষাকৃত স্বস্তি ফিরেছে। অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়ার কারণে ছয় মাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ওঠা এবং বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকাকে তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। তবে অর্থনীতির সার্বিক দুরবস্থা এখনো কাটেনি। রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতের প্রতি আস্থা এবং মূল্যস্ফীতি—সব ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে কাজ বাকি রয়েছে। সবচেয়ে বেশি জনভোগান্তি তৈরি করেছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট। দায়িত্ব নেওয়ার পর রমজানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও পরে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেয়। এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংও বেড়েছে। সরকার বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবকে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গ্যাস সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দিয়েছেন। মূল্যস্ফীতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও অর্থবছরের প্রথম মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। কিছু পণ্যের দাম কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এখনো স্বস্তি ফেরেনি। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। মার্চে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগের পর নতুন কমিশন এখনো দায়িত্ব নেয়নি। ফলে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনেও রদবদল অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ ও জনপ্রশাসনে বেশ কিছু পরিবর্তনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল এসব পদক্ষেপকে দলীয়করণের অভিযোগে সমালোচনা করেছে। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারও বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডির মতো ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। খুন, ডাকাতি, চুরি, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে জঙ্গি তৎপরতা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কৃতিত্ব ও ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের বিরোধ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জাতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চার বছরের মধ্যে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি পরিবার মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে পাওয়ার কথা। কৃষক কার্ডের প্রি-পাইলট কার্যক্রমও এগিয়েছে। কৃষকদের ন্যায্যমূল্যে সার ও কৃষি উপকরণ, সহজ শর্তে ঋণসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে এই কর্মসূচির মাধ্যমে। তবে ই-হেলথ কার্ড এখনো মাঠপর্যায়ে চালু হয়নি। প্রকল্পটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। খাল খনন কর্মসূচিতেও সরকার অগ্রগতি দাবি করছে। সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন বা পুনঃখননের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে সরকার। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সবটা বাস্তবায়ন হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ক্রীড়াবিদদের জন্য ক্রীড়া কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে প্রথম ধাপে ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়েছে। একইভাবে বিপুলসংখ্যক মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমকে নির্দিষ্ট হারে ভাতা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটিও গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়গুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দল সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ছয় মাসের মধ্যে একটি সরকারের সামগ্রিক সাফল্য-ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কঠিন। তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বিদ্যুৎ, গ্যাস, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলোতে দ্রুত ফল দেখাতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক হোসেনের মতে, বিএনপি সরকারের শুরুটা ভালো হয়েছে এবং নির্বাচনের পর তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হওয়াই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে সাবেক আমলা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী ইমাম মজুমদার মনে করেন, সরকারকে আরও রাজনৈতিকভাবে সহনশীল হতে হবে। তার মতে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির যে ধারণা ছিল, বর্তমান সরকারকেও সেই দর্শনে চলা উচিত। সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে একদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কয়েকটি নির্বাচনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি রয়েছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক রদবদল ও দুর্নীতি দমন নিয়ে প্রশ্নও রয়ে গেছে। ফলে সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—প্রথম ছয় মাসের উদ্যোগগুলোকে কত দ্রুত সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তিতে রূপ দেওয়া যায়। তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ