প্রকাশ :: ... | ... | ...

আফগানিস্তানে পাকিস্তানি বিমান হামলায় নিহতদের স্বজনদের প্রশ্ন, ‘কেন এই হত্যা’


সংযুক্ত ছবি

হামলায় পুরো হাসপাতালটি ধ্বংস হয়ে যায়। ছবি: রয়টার্স

এক বৃষ্টিস্নাত শীতল সকালে উত্তরপশ্চিম কাবুলের পাহাড় ঘেরা এক কবরস্থানের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন মাসুদা। সেখানে শায়িত তার ছোট ভাই মিরওয়াইস। তবে দুই মাস আগে পাকিস্তানি বিমান হামলায় নিহত ভাইয়ের কবরটি ঠিক কোথায়, তা মাসুদা জানেন না। এর বদলে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন একটি গণকবরের কিনারে; ছোট সাদা পাথরে ঢাকা আর ধূসর গ্রানাইট স্ল্যাব দিয়ে চিহ্নিত এই স্থানটিই এখন অন্তত ২৬৯ জন মানুষের শেষ ঠিকানা, যারা একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে হওয়া ওই হামলায় প্রাণ হারান। এই কবরে ঠিক কতজন শায়িত আছেন তা বলা অসম্ভব। ২৪ বছর বয়সী মিরওয়াইসের মতো অনেকের দেহই শনাক্ত করার অবস্থায় ছিল না, কারো দেহ ছিল ছিন্নভিন্ন, কেউবা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গিয়েছিল। কান্নাভেজা কণ্ঠে ২৭ বছর বয়সী মাসুদা বিবিসিকে বলেন, “আমার ভাইয়ের শরীর টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আমাদের দেওয়ার মতো তার শরীরে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। তারা শুধু তার ধড়টুকু খুঁজে পেয়েছিল। একটি জন্মদাগ দেখে আমি তাকে শনাক্ত করি।” ‘ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন হাসপাতাল’-এ হওয়া এই হামলাটি আফগানিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ, সম্ভবত সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা। এমনকি তালেবান, নেটো ও আফগান সরকারি বাহিনীর মধ্যে চলা ২০ বছরের যুদ্ধেও এমন নজির বিরল। মঙ্গলবার জাতিসংঘ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২৬৯ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে তারা বলেছে যে প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি। এই হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করার দাবি উঠছে। আফগানিস্তানের কাবুলে পাকিস্তানি বিমান হামলায় ধ্বংস হওয়া একটি মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে লড়াই চলছে, এতে শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই পাকিস্তানি বিমান হামলার শিকার। ইসলামাবাদের অভিযোগ, তালেবান সরকার আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলাকারী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে। তবে কাবুল এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের এই হত্যাকাণ্ড এ বছর চলমান লড়াইয়ে প্রাণহানির সিংহভাগ দখল করে আছে। নিহতের এই সংখ্যা আফগানিস্তানকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, যদিও দীর্ঘদিনের সহিংস সংঘাতের সঙ্গে দেশটি পরিচিত। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী জাতিসংঘ টিম এবং হামলার পরপরই সেখানে উপস্থিত হওয়া বিবিসি আফগান সার্ভিসের টিম নিশ্চিত করেছে যে, হামলায় মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসারত বেসামরিক নাগরিকরাই প্রাণ হারিয়েছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এটিকে একটি ‘বেআইনি হামলা এবং সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। তবে পাকিস্তান বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা অস্বীকার করেছে। বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, “কোনো হাসপাতাল, মাদক নিরাময় কেন্দ্র বা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়নি। আমাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল সামরিক ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো।” এই দাবিতে ক্ষুব্ধ মাসুদা বলেন, “পাকিস্তান মিথ্যা বলছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি এটি কোনো সামরিক ক্যাম্প ছিল না। সেখানে সুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য পুরুষরা ভর্তি হয়েছিলেন।” একই কথা বলছেন আরও অনেকে। বিবিসি ৩০টিরও বেশি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যাদের মধ্যে সুস্থ হতে থাকা মাদকাসক্ত এবং কেন্দ্রের কর্মীরাও রয়েছেন, যারা পাকিস্তানের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওমিদ সেন্টারটি ‘ক্যাম্প ফিনিক্স’ নামক একটি প্রাক্তন সামরিক প্রশিক্ষণ চত্বরে অবস্থিত, যা এক সময় যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো বাহিনী ব্যবহার করত; এটি কোনো নতুন স্থাপনা নয়। ২০১৬ সালে আমেরিকানরা ওই ঘাঁটি ত্যাগ করার পর আর ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর আগে ওমিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা বেশ পরিচিত ছিল এবং দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে এ কেন্দ্রটি নিয়ে প্রচুর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি ২০২৩ সালে মাদকাসক্তদের সঙ্গে কথা বলতে বিবিসির একটি দলও ওই কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। আফগানিস্তানে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাই কমিশনারের প্রতিনিধি ফিওনা ফ্রেজার বলেন, “এটি জাতিসংঘের প্রধান কার্যালয় থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। আমাদের জাতিসংঘ সংস্থাগুলো ওই হাসপাতালের রোগীদের সহায়তা দিয়ে আসছিল। ফলে স্থানটি আমাদের কাছে সুপরিচিত ছিল।” মিরওয়াইস ছিলেন মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াই করা আনুমানিক ৩০ লাখ আফগানের একজন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর মাসুদা তাকে সন্তানের মতো করে বড় করেছিলেন। তিনি জানান, মিরওয়াইস ফার্মাসিস্ট হওয়ার জন্য পড়াশোনা করছিলেন, আর তখনই তিনি ‘ট্যাবলেট-কে’ (মেথামফেটামিন বা ওপিওড সমৃদ্ধ সিন্থেটিক ড্রাগ) নামক মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। মাসুদা বলেন, “সে ছিল এক সাদাসিধে ছেলে যে খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়েছিল। সে ওমিদে ভর্তি হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় বিমান হামলার ঘটনা ঘটে।” সেদিন ডিউটিতে থাকা একজন চিকিৎসক বিবিসিকে জানান, ১৬ মার্চ স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে কাবুল-জালালাবাদ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত ওই স্থাপনায় তিনটি বোমা পড়ে। সরকারের অনুমতি না থাকায় পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, “একটি বোমা নতুন রোগীদের যেখানে রাখা হতো সেখানে আঘাত হানে। অন্য দুটি বোমা কন্টেইনার, কাঠের ব্লক, খাদ্য গুদাম ও প্রশাসনিক দপ্তরে আঘাত হানে।” জাতিসংঘের ফিওনা ফ্রেজার উল্লেখ করেন যে বোমাগুলো হাসপাতালের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও আঘাত করেছিল, যা কাঠের তৈরি হওয়ায় বিশাল অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হতাহতের প্রধান কারণ ছিল স্প্লিন্টার এবং আগুনের ক্ষত। অনেক দেহ শনাক্ত করা অসম্ভব ছিল কারণ সেগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। ওই চিকিৎসক আরও বলেন, “আমি জীবনে এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখিনি। আমি লাশের স্তূপের মধ্য দিয়ে হেঁটে কাউকে জীবিত পাওয়া যায় কি না তা খুঁজছিলাম, আর্তনাদ শুনছিলাম। পোড়া মাংসের গন্ধ সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল।” কাবুলে সাদিক ওয়ালিজাদার কাছে ফোন আসে যে ওই কেন্দ্রে বোমা হামলা হয়েছে। এরপর শুরু হয় তার ভাই ৩৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আনোয়ার ওয়ালিজাদাকে খোঁজার যন্ত্রণাদায়ক প্রচেষ্টা। আনোয়ারও ‘ট্যাবলেট-কে’তে আসক্ত ছিলেন এবং হামলার মাত্র চার দিন আগে সেখানে ভর্তি হয়েছিলেন। সাদিক বলেন, “আমরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেছি। অনেক মৃতদেহ ছিল, সব ছিন্নভিন্ন। আমরা আশা করছিলাম আমাদের ভাই হয়তো পালিয়ে বেঁচেছেন।” জাতিসংঘের তথ্যমতে, আগুনে রোগীদের তালিকা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্বজনদের খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সাদিক ও তার অন্য ভাইয়েরা প্রতিদিন পুড়ে যাওয়া মরদেহের ভয়াবহ সব ছবি দেখতেন আনোয়ারকে চেনার আশায়। চার দিন পর যখন বিশ্বজুড়ে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, তখন তারা একটি ছবিতে পোশাকের টুকরো দেখে তাদের ভাইকে শনাক্ত করেন। কাঁপা কণ্ঠে সাদিক বলেন, “সে বেঁচে আছে না মরে গেছে তা না জানাটা ছিল চরম যন্ত্রণার। এরপর তার অর্ধেক শরীর খুঁজে পাওয়া ছিল অসহ্য কষ্টের। তবুও অন্তত তাকে খুঁজে পেয়েছি এটাই স্বস্তি। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে কোনোদিন খুঁজে পায়নি কারণ শরীরগুলো এতটাই পুড়ে গিয়েছিল।” আনোয়ার ছিলেন ছয় সন্তানের জনক। অভাবের সংসারে বোতলজাত পানি বিক্রি করতেন। দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের কারণে তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার চাচা আব্দুল ওয়াহিদ বলেন, “আমার ভাগ্নে কাজ খুঁজে পায়নি, দারিদ্র্যই তাকে আসক্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে।” কেন এই নিরাময় কেন্দ্রে হামলা হলো, সেই প্রশ্নে জর্জরিত পরিবারগুলো। হামলায় ভাই আজমলকে হারানো ওয়াহিদ সায়লানি প্রশ্ন করেন, “পাকিস্তান কেন এমন করল? কেন তারা নিরপরাধ মানুষকে বোমা মারল?” পাকিস্তান বারবারই দাবি করছে ওই কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিরা নিরপরাধ ছিলেন না। বিবিসির প্রশ্নের জবাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী একটি সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি পাঠিয়েছে, যেখানে মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেছেন, “তারা এই মাদকাসক্তদের আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী হিসেবে ব্যবহার করে। ওই কেন্দ্রটি সম্ভবত একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ছিল।” ভুক্তভোগী প্রতিটি পরিবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। মিরাজ আলী মোহাম্মদ বলেন, “আমার ভাই মিলাদ অসুস্থ ছিল, আমরা তাকে চিকিৎসার জন্য সেখানে নিয়ে গিয়েছিলাম। সবাই জানে ওটা ছিল হাসপাতাল, কোনো সন্ত্রাসী কেন্দ্র নয়।” ভাই রহিমুল্লাহকে হারানো জাহিদুল্লাহ খান বলেন, “ওটা যে হাসপাতাল ছিল তার ভিডিও আমার কাছে আছে। সেখানে সামরিক কিছুই ছিল না।” নিহত এমাল আব্দুল মালিক ওই কেন্দ্রের একজন কর্মচারী ছিলেন। তার ভাই হেদায়াতুল্লাহ বলেন, “সে হাসপাতালের রান্নাঘরের সহকারী ছিল। তারা সব রোগীর জন্য রান্না করত, সেখানে সবাই রোগী ছিল।” তালেবান সরকারের জন্য এই সংঘাত প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক গুরুতর মোড়। ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রথম আফগানিস্তান সফর করেছিলেন। এখন দুই পক্ষ প্রকাশ্য সংঘাত ও বাদানুবাদে লিপ্ত। কাবুলে তালেবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত বিবিসিকে বলেন, “নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যস্থল করা যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত এই ঘটনার তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচার করা।” অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করছে, গত বছর থেকে তাদের শত শত বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) দায়ী, যাদের তালেবান সরকার আশ্রয় দিচ্ছে। তালেবান মুখপাত্র ফিতরাত বলেন, আফগানিস্তান তার ভূখণ্ড কারো বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয় না। তিনি দাবি করেন, টিটিপি ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানে সক্রিয় এবং এটি কোনো নতুন বিষয় নয়। রাজধানী কাবুলের কেন্দ্রস্থলে এই হামলা আফগানদের সেই শান্তিকে চুরমার করে দিয়েছে যা তারা ২০২১ সালের যুদ্ধের পর ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছিল। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিচার পাওয়ার কোনো আশা নেই বললেই চলে। নিহত একজনের ভাই বলেন, “আমরা এক নিপীড়িত জাতি। আমাদের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। আমরা অবিচার ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছি। সৃষ্টিকর্তাই যেন অপরাধীদের বিচার করেন।” সূত্র : বিডিনিউজ