প্রকাশ :: ... | ... | ...

আফগান মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উপর পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশোধ


সংযুক্ত ছবি

পাকিস্তানে পরীক্ষা দিচ্ছেন আফগান মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। ছবি: অ্যাটলাস প্রেস

পাকিস্তানে পড়তে আসা আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন করে ভর্তি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি দেশটির মেডিকেল ও ডেন্টাল প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে অধ্যয়নরত আফগান শিক্ষার্থীদেরও পড়াশোনা স্থগিত রেখে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বলেছে পাকিস্তান মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল—পিএমডিসি। প্রতিষ্ঠান বদল বা স্থানান্তরের সুযোগও বন্ধ করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে এটি এসেছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাশিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার মাধ্যমে। কিন্তু সিদ্ধান্তটির সময়, ব্যাপকতা এবং দুই দেশের বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই শিক্ষানীতির সিদ্ধান্ত, নাকি আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের ওপর পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ তৈরির আরেকটি হাতিয়ার? তবে দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি, সীমান্ত সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ এবং আফগান নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ব্যাপক প্রত্যাবাসন নীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি সম্ভাব্য অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি নতুন নয়। তালেবান ২০২১ সালে কাবুলের ক্ষমতায় ফেরার পর একসময় যে সম্পর্ককে পাকিস্তানের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেটিই ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকে গেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান—টিটিপি—সহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানে হামলা চালানোর সুযোগ পাচ্ছে। আফগান তালেবান সরকার পাকিস্তানের এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ফলে ইসলামাবাদের কাছে এখন আফগানিস্তান শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার একটি বড় ইস্যু। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে আফগান ভূখণ্ড থেকে সশস্ত্র হামলার ঝুঁকি যত বাড়ছে, কাবুলের ওপর চাপ তৈরির প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। সামরিক ও কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি অর্থনীতি, সীমান্ত, অভিবাসন এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে। এই বৃহত্তর চাপের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসন। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ লাখের বেশি আফগান পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ফিরে গেছেন; তাঁদের একটি অংশকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছে। জাতিসংঘও পাকিস্তানকে আফগানদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রত্যাবাসনকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ করার কথা বলেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন সিদ্ধান্তটি এসেছে। পাকিস্তানের সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিকটি হলো—আফগান শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও শিক্ষাগত যোগাযোগের অংশ। চিকিৎসাশিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও পেশাগত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। সেই পথ হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া মানে শুধু কয়েকটি ভর্তি বাতিল করা নয়; এর মাধ্যমে দুই দেশের মানবিক ও শিক্ষাগত যোগাযোগও সংকুচিত হয়। পিএমডিসির নির্দেশনা শুধু ভবিষ্যৎ ভর্তি বন্ধ করেনি। ইতোমধ্যে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদেরও দেশে ফিরে যেতে বলেছে। ফলে যারা কয়েক বছর ধরে অর্থ ব্যয় করে পড়াশোনা করছেন, তাঁদের শিক্ষা মাঝপথে থেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে আফগানিস্তানে পড়াশোনা করা পাকিস্তানি মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। আফগানিস্তানে পড়া পাকিস্তানি শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের একটি অংশকে লাইসেন্সিং পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬ হাজার পাকিস্তানি শিক্ষার্থী আফগানিস্তানে চিকিৎসাশিক্ষা নিচ্ছেন এবং প্রায় ৪ হাজার ইতোমধ্যে পড়াশোনা শেষ করেছেন। অর্থাৎ শিক্ষা এখন দুই দেশের পারস্পরিক চাপের ক্ষেত্রেও পরিণত হচ্ছে—এমন একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর পেছনে অবশ্য একটি বাস্তব নীতিগত যুক্তিও রয়েছে। মেডিকেল শিক্ষা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পেশা। কোন দেশের কোন প্রতিষ্ঠান স্বীকৃত, কোন ডিগ্রি গ্রহণযোগ্য এবং কোন শিক্ষার্থী পেশাগত নিবন্ধনের যোগ্য—এসব বিষয়ে পিএমডিসির নিজস্ব মানদণ্ড রয়েছে। এমনকি আফগানিস্তানের কিছু মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নিয়েও পিএমডিসির নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণের যুক্তি থাকলে কেন আফগান নাগরিকদের নতুন ভর্তি, স্থানান্তর এবং ইতোমধ্যে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই সঙ্গে এত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের বর্তমান সংকটকে সামনে রাখতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে নিরাপত্তা ইস্যুতে। একসময় পাকিস্তান তালেবানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন ইসলামাবাদ ও কাবুল পরস্পরের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা হুমকির অভিযোগ তুলছে। সীমান্তে সংঘর্ষ, টিটিপির তৎপরতা এবং আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানি সামরিক হামলা দুই দেশের সম্পর্ককে কার্যত ‘ওপেন ওয়ার’-এর পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। এই অবস্থায় ইসলামাবাদের জন্য কাবুলকে বোঝানোর প্রচলিত কূটনৈতিক পথগুলো কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ফলে আফগান নাগরিকদের ওপর অভিবাসন ও শিক্ষাসংক্রান্ত বিধিনিষেধ কাবুলের ওপর পরোক্ষ চাপ তৈরির একটি মাধ্যম হতে পারে। এখানেই ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ শব্দটির বিশ্লেষণগত জায়গা তৈরি হয়। যদি কোনো সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ নাগরিক এমন একটি ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হন, যার সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই, তাহলে সেটিকে রাজনৈতিক চাপের ‘collective punishment’-এর কাছাকাছি হিসেবে দেখা যায়। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা টিটিপির সঙ্গে যুক্ত নন, সীমান্ত সংঘর্ষে তাঁদের ভূমিকা নেই, পাকিস্তান-আফগানিস্তানের কূটনৈতিক বিরোধেও তাঁদের কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। তারপরও তাঁদের পড়াশোনার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনৈতিক সংকটের খরচ তাঁদের ওপর এসে পড়ে। এখানেই পাকিস্তানের সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করতে পারে। পাকিস্তান শুধু শিক্ষার্থীদের নিয়েই কঠোর হচ্ছে না। আফগান নাগরিকদের প্রত্যাবাসন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা নীতিতেও ইসলামাবাদ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ফলে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে বিচ্ছিন্ন একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার বদলে বৃহত্তর ‘Afghan policy’-এর অংশ হিসেবে দেখা আরও যৌক্তিক হতে পারে। তবে এর বিপরীত যুক্তিও আছে। পাকিস্তান বলতে পারে, একটি দেশের মেডিকেল শিক্ষা তার জাতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি বা অবস্থান কোনো দেশের অধিকার হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত নয়। বিশেষ করে যখন দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত খারাপ, তখন বিদেশি নাগরিকদের ওপর অতিরিক্ত যাচাই বা বিধিনিষেধ আরোপের অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। একইভাবে আফগানিস্তানে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি ও লাইসেন্সিং নিয়ে পিএমডিসির উদ্বেগও সম্পূর্ণ অমূলক নয়। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় তখনই, যখন নিরাপত্তা বা স্বীকৃতির যুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত শিক্ষাজীবনের ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও দুই দেশের জন্য কম নয়। পাকিস্তান বহু বছর ধরে আফগানিস্তানের সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করেছে। আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য পাকিস্তান ছিল তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য উচ্চশিক্ষার গন্তব্য। সেই দরজা বন্ধ হলে আফগান শিক্ষার্থীদের বিকল্প দেশ খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে পাকিস্তানও আফগানিস্তানে তার দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ও সামাজিক প্রভাব হারাতে পারে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত যদি শিক্ষা ও মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ নাগরিকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে আপাতত সরাসরি ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো সরকারি প্রমাণ নেই। কিন্তু সিদ্ধান্তটির সময়কাল এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তানের গভীর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংকট একসঙ্গে বিবেচনা করলে এটিকে **কাবুলের ওপর চাপ সৃষ্টির বৃহত্তর নীতির একটি সম্ভাব্য উপাদান** হিসেবে দেখা যায়। আর যদি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বিরোধের কারণে চিকিৎসাশিক্ষার মতো মৌলিক মানবিক ক্ষেত্রকে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে রাজনীতির বাইরে থাকা তরুণ শিক্ষার্থীদেরই। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিরোধ এখন আর শুধু সীমান্ত বা সন্ত্রাসবাদে সীমাবদ্ধ নেই। অভিবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাণিজ্য—একসময় যে ক্ষেত্রগুলো দুই দেশের মানুষকে কাছাকাছি এনেছিল, সেগুলোও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চাপের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। আফগান মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক উদাহরণ।