প্রকাশ :: ... | ... | ...

আমিরাতের ‘মুখ বন্ধ’ করতেই কি গোপনে আবুধাবি গিয়েছিলেন নেতানিয়াহু?


সংযুক্ত ছবি

৭ অক্টোবরের হামলার আগে সতর্কবার্তা পাওয়ার অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক; বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে ভিন্ন ভাষ্য ইসরায়েল ও আমিরাতের **আন্তর্জাতিক ডেস্ক:** হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার আগে সম্ভাব্য বড় ধরনের আক্রমণ সম্পর্কে সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কি না—এই বিতর্কের মধ্যেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত রোববারের ওই অঘোষিত সফরে তিনি আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামাসের হামলার আগে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তাঁকে সতর্ক করেছিলেন—এমন প্রতিবেদন অস্বীকার করতে নেতানিয়াহু বৈঠকে অনুরোধ জানিয়ে থাকতে পারেন। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াম এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পরে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করে। তাদের প্রকাশিত ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার করা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ছিল বৈঠকের বিষয়। তবে সফর সম্পর্কে আগে থেকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বৈঠক সম্পর্কে অবহিত দুই ব্যক্তির বরাতে বলা হয়েছে, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন—ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। তাঁদের একজনের দাবি, প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে অস্বীকার করতে শেখ মোহাম্মদকে অনুরোধ করেন নেতানিয়াহু। তবে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ অভিযোগকে ‘ভুয়া সংবাদ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বৈঠকের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে তাই দুই ধরনের ভাষ্য সামনে এসেছে। আমিরাত ও ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কবার্তার বিতর্কও বৈঠকের আলোচ্য হয়ে থাকতে পারে। আমিরাতের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার করা হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরং ইসরায়েলের সঙ্গে ‘খোলামেলা ও সরাসরি যোগাযোগ’ বজায় থাকার কথা জানিয়েছে। আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে বিতর্ক গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, সতর্কবার্তাটি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছানো হয়নি। প্রতিবেদনটি সাংবাদিক শ্লোমি এলদার ও রুথ ইউভালের একটি প্রকাশিতব্য বইয়ের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই দাবি অস্বীকার করেছে। প্রধানমন্ত্রীও অভিযোগটিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং সংবাদপত্রটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ফলে হামলার আগে আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরাসরি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে এখনো পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। শুধু আমিরাত নয়, হামলার আগে মিসরের পক্ষ থেকেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে ইসরায়েলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসরের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেলও হামলার আগে গাজায় পরিস্থিতির অবনতি ও বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা সম্পর্কে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছিলেন। এসব তথ্যের কিছু অংশ নিয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে কোন সতর্কবার্তা কখন, কাকে এবং কীভাবে দেওয়া হয়েছিল—তা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে ৭ অক্টোবরের হামলা প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী নেতারা হামলার আগে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যর্থতার দায় প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়েছেন। নেতানিয়াহু অবশ্য আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করছেন। নেতানিয়াহু সম্প্রতি নির্বাচনের আগে শত্রুপক্ষের হামলার আশঙ্কার কথাও বলেছেন এবং বিষয়টি বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদকে জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লাপিদ এই বক্তব্যকে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখেছেন বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে আসন্ন নির্বাচনে নিরাপত্তা ইস্যু ভোটারদের সিদ্ধান্তে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। বৈঠকের সময়কাল নিয়েও ভিন্ন তথ্য নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরের সময়কাল এবং বৈঠকের আলোচ্য বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে পার্থক্য রয়েছে। এপির সূত্রগুলো বৈঠকটি প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা তিন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, বৈঠকটি প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলে এবং ইরান ছিল আলোচনার প্রধান বিষয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আগের কিছু প্রতিবেদনে নেতানিয়াহুর আমিরাতে অবস্থানের সময় প্রায় চার ঘণ্টা বলা হয়েছিল। ফলে বৈঠকের সুনির্দিষ্ট সময়কাল ও আলোচ্যসূচি সম্পর্কে পুরোপুরি একমত তথ্য পাওয়া যায়নি। ওয়ামের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই নেতা আমিরাত ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং তা আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ ও দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি সামনে এনেছে। এসব আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কবার্তার অভিযোগের উল্লেখ নেই। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েল ও আমিরাতের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছে। ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের যোগাযোগ বজায় রয়েছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আমিরাতকে আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাব বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়েছে। তবে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেও ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে বিতর্ক দুই দেশের জন্য স্পর্শকাতর। আমিরাতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত বক্তব্য না আসায় বৈঠকে ঠিক কী আলোচনা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। নেতানিয়াহুর কার্যালয়ও এপি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নির্দিষ্ট অভিযোগের বিস্তারিত জবাব দেয়নি; বরং আগের প্রতিবেদনগুলোকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে নেতানিয়াহুর আবুধাবি সফরকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে, নাকি ৭ অক্টোবরের আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সামলানোর উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচনা করা হবে—তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য হলো, সফর ও বৈঠক হয়েছে; কিন্তু সতর্কবার্তা অস্বীকারের অনুরোধই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা প্রকাশ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।