প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইতিহাসে কীভাবে থাকবেন ট্রাম্প, ফয়সালা হতে পারে ইরান যুদ্ধে


সংযুক্ত ছবি

ইরান যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার গল্পটা ডনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, প্রশ্নটা আর সে জায়গায় নেই। সবশেষ প্রশ্ন যেটা দাঁড়িয়েছে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কব্জায় আছে তো? একবার শুরু হয়ে গেলে একটা যুদ্ধ কখনো কখনো নিজেই গতিপথ ঠিক করে নেয়। হোয়াইট হাউজের আভাসের সঙ্গে সেই গতিপথ নাও মিলতে পারে। পরিবর্তিত সেই পরিস্থিতিতে একজন প্রেসিডেন্ট যদি ঠিকঠাক দিক দেখাতে না পারেন, তাহলে রাজনৈতিক চোরাবালিতে তার আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, তিন সপ্তাহ পরে গিয়ে পরিস্থিতি হয়ত আরও অনুকূলে থাকবে। কিন্তু তিন সপ্তাহ পরে এসে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ মিলছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করে দিতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু ইরান যুদ্ধটা ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথও কার্যত বন্ধ রেখেছে। হরমুজ বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পড়েছে; গ্যালনপ্রতি তেলের দাম চলে গেছে ৪ ডলারের কাছাকাছি। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল যে ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাবে, সেটা তিনি জানতেন না। কিন্তু সিএনএন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, তাতে ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বাস করা কঠিন। পরে অবশ্য আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে ট্রাম্প বলেন, তিনি নাকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘এ কাজ করো না’। এ ঘটনা ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এ যুদ্ধ ইসরায়েলের। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে পড়ে যাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ। এসব দেশ বলছে, তাদের আধুনিক নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন এক যুদ্ধের কারণে হুমকিতে পড়ে গেছে, যে যুদ্ধ তারা চায়নি, যে যুদ্ধ শুরু করেছে তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে হরমুজ খোলা রাখার লড়াইয়ে ইউরোপের দেশগুলোকে পাশে না পেয়ে প্রায়ই ক্ষোভ ঝাড়ছেন ট্রাম্প। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস চলতি সপ্তাহে বলেছেন, “এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।” ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিষয়টি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ট্রাম্প বলেন, ‘শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে’। কিন্তু সেই ‘শিগগিরই’ কখন আসবে, তা কখনো তিনি বলেননি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই, `আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় লক্ষ্য অর্জন করেছি— এ ঘোষণা কখন দেব, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টই নেবেন।' কিন্তু যুদ্ধ কত দিন চলবে, এই প্রশ্ন ট্রাম্পকে শুনতেই হবে। ইরান যুদ্ধের জন্য পার্লামেন্টে গিয়ে যখন তিনি ২০ হাজার কোটি ডলার চাইবেন, তখন আইনপ্রণেতারা যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে ঠিকই প্রশ্ন তুলবেন। সিনেটর লিসা মুরকোস্কি বলেন, “আলাস্কার মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করছে, এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? এতে কি স্থলসেনা পাঠানো হবে? এর খরচ কত হবে?’ আলাস্কায় এই প্রশ্নগুলো জোরেশোরে উঠেছে, কারণ যুদ্ধে যাওয়া সেনার সংখ্যা সেখানে বেশি। সিএনএন লিখেছে, সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রিপাবলিকানরা সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে যদি আপত্তি ওঠে, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ডেমোক্র্যাটরা কী ট্রাম্পের যুদ্ধে অর্থায়নে সম্মতি দেবে? একটা উত্তর অবশ্য হাউস স্পিকার মাইক জনসনের মুখ থেকে এসেছে, “আমরা বিষয়টা দেখব।’ চিরস্থায়ী যুদ্ধ নয় প্রেসিডেন্ট তার অবস্থানে এখনো দৃঢ় আছেন। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে তিনি বলেন, ‘ধ্বংস করার মতো যা কিছু ছিল, আমরা প্রায় সবই ধ্বংস করে ফেলেছি।’ অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সাংবাদিকদের সমালোচনা করে বলেন, “এই সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় কেউ কেউ ভাবছেন আমরা যেন এক অন্তহীন অতল গহ্বরের দিকে যাচ্ছি। কেউ কেউ আবার বলছেন, এটা চিরস্থায়ী যুদ্ধ বা এক জটিল ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।’ একদিক থেকে দেখলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায় যুক্তি আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা বিমান হামলা নিঃসন্দেহে সামরিক দিক থেকে একটি সফলতা এনে দিয়েছে। কারণ ইরানের আঞ্চলিক হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটা কমে গেছে। কিন্তু এই হামলা কি দেশটির শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক ভিত্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পেরেছে? জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বলেন, ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে, তবে ‘এখনো টিকে আছে বোধহয়’। সে হিসাবে, ইরান হয়তো ট্রাম্পের যুদ্ধে হারছে, কিন্তু নিজের যুদ্ধে জিতছে। তারা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাবে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের উপর। তেহরান ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এক্ষেত্রে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইরান যে হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারে, সেই শঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্ব দেয়নি। যুদ্ধ শুরুর সাত দিন আগেও হেগসেথ এই সমুদ্রপথ নিয়ে বলেছিলেন, “এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।’ সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রণালিটি পুনরায় চালু করা বিপজ্জনক হবে। আকাশ থেকে বোমা ফেলে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না। প্রণালির আশপাশের পাহাড় থাকায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করতে বড় ধরনের স্থলবাহিনী প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সব কিছু মিলিয়ে ট্রাম্প এমন এক কঠিন সিদ্ধান্তের কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন, যার মুখোমুখি প্রায় সব কমান্ডারকেই হতে হয়— যুদ্ধ শেষ করতে চাইলে আগে কি সেটা বাড়িয়ে নিতে হবে? ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। পাঠালে আপনাদের বলতাম না, কিন্তু আমি পাঠাচ্ছি না।’ বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমাতে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রস্তাব দিয়েছেন, সমুদ্রে থাকা ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে। বাইডেন প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে ইরান বিষয়ক পরিচালক ছিলেন নেট সোয়ানসন। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্পের ইরান বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী দলের হয়েও কাজ করেছেন তিনি। সিএনএনকে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কী, সেটাই এখনো পরিষ্কার নয়। আর প্রতিদিনই লক্ষ্য বদলাচ্ছে। আসলে শুরুতেই বোঝা উচিত ছিল যে, এটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হবে, কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি।” কবে ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করবেন এবং সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনবেন, ওয়াশিংটন এখন সেই অপেক্ষায় আছে। কিন্তু সংঘাত যেভাবে বাড়ছে, তাতে হয়তো তার সামনে আর সেই সুযোগ নেই। হেগসেথ অবশ্য বলেছেন, “যুদ্ধের সময় নিয়ে কেউই নিখুঁত কোনো ধারণা দিতে পারে না।’ সিএনএন লিখেছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ কথা সত্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ‘নিখুঁত ধারণার’ ধারেকাছেও নেই। নতুন একটি যুদ্ধ বাধালেও ট্রাম্প আর সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। যুদ্ধ কতদিন চলবে, কতদূর ছড়াবে, কত খরচ হবে এবং মূল্যস্ফীতিই বা মানুষকে কতটা ভোগাবে, সেই নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে আর নেই। বরং ট্রাম্পকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে, সেই ফয়সালাও ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়ে যেতে পারে।