বাহরাইনের মানামার সিফ এলাকায় ইরানের ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি জ্বলন্ত ভবন থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ছবি। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দোহা, দুবাই ও মানামার বহুতল ভবনগুলো ক্ষতবিক্ষত হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো পড়েছে এক জটিল কূটনৈতিক ও সামরিক দ্বিধায়। পাল্টা আঘাত হানলে তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ উঠবে, আর নীরব থাকলে সবাই দুর্বলতার বার্তা পাবে— এই দুই ঝুঁকির মাঝে নিজেদের নিরাপত্তা, সুনাম ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় এখন কঠিন হিসাব কষছে অঞ্চলটির দেশগুলো। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র দোহা, দুবাই ও মানামার বহুতল ভবনে আঘাত হানার পর শুধু কাচ ও কংক্রিটই ভাঙেনি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার বাইরে নিজেদের স্থিতিশীলতার মরূদ্যান হিসেবে গড়ে তোলা উপসাগরীয় দেশগুলোর ভাবমূর্তিতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। আর এখন তারা এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে— পাল্টা আঘাত হেনে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগ নেবে, নাকি নিষ্ক্রিয় থেকে নিজেদের শহরগুলোকে আগুনে পুড়তে দেখবে? সপ্তাহান্তে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কাতারের দোহা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও বাহরাইনের মানামায় আঘাত হানে। এর ফলে শুধু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, উপসাগরীয় দেশগুলোর দীর্ঘদিনের স্থিতিশীল ভাবমূর্তিও বড় আঘাতের মুখে পড়ে। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মনিকা মার্কস আল জাজিরাকে বলেন, ‘মানামা, দোহা ও দুবাইয়ে বোমা হামলার দৃশ্য এখানকার মানুষ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে যেমন অকল্পনীয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে শার্লট, সিয়াটল বা মিয়ামিতে হামলা হলে যেমন মনে হতো তেমনই।’ শনিবার শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বৃহৎ হামলার জবাবে ইরান এ পাল্টা আঘাত হানে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও দেশটির শীর্ষ সামরিক নেতারা নিহত হন। ইরানজুড়ে সামরিক ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। একটি স্কুলেও আঘাত লাগে। ওই হামলায় অন্তত ১৪৮ জন নিহত হন। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত হন এবং রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ কিংবা সরাসরি আঘাতে দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোহার কিছু এলাকায় ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়। সৌদি আরব জানায়, ইরান রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে। কাতার জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে ১৬ জন আহত হয়েছেন। ওমানে আহত হয়েছেন পাঁচজন, কুয়েতে ৩২ জন এবং বাহরাইনে চারজন। যে যুদ্ধ ঠেকাতে চেয়েছিল তারা উপসাগরীয় দেশগুলো এ সংঘাত চায়নি। হামলার আগের সপ্তাহগুলোতে ওমান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার এবং বিদ্যমান মজুত বড় পরিসরে পাতলা করার প্রতিশ্রুতি দেয়ায় শান্তি বেশ ‘হাতের নাগালেই’ ছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। মনিকা মার্কস বলেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলো কয়েক সপ্তাহ, এমনকি মাসজুড়ে ধীরে ধীরে এ যুদ্ধের আগমনের লক্ষণ দেখছিল এবং তা ঠেকাতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। তার ভাষ্য, কোণঠাসা ইরানি শাসনব্যবস্থা আত্মসমর্পণের বদলে প্রতিবেশীদেরও এই সংঘাতে টেনে নেয়ার পথ বেছে নিতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের ছিলই। কিংস কলেজ লন্ডনের প্রভাষক রব গাইস্ট পিনফোল্ডও বলেন, জিসিসি দেশগুলো সামরিক পদক্ষেপ ঠেকাতে জোরালো চেষ্টা করেছে। তারা এ যুদ্ধ চায়নি এবং এর বিরুদ্ধে তদবির করেছে। তার মতে, এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করছে এমন ভাবমূর্তি তৈরি হওয়া তাদের বৈধতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ইরানের হামলার মুখে নিষ্ক্রিয় থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। পিনফোল্ড বলেন, ইরান যদি ধারাবাহিক হামলা চালায় আর তারা কিছুই না করে, তাতেও তাদের অবস্থান দুর্বল হবে। সরকারগুলো জনমতের প্রতি সাড়া দেয়, অর্থাৎ তারা নিজেদের জনগণ, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী হিসেবে দেখাতে চায়। দুই বিশ্লেষকই মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কোনও পদক্ষেপ নিতে পারে, তবে তা কেবল নিজেদের শর্তে। পিনফোল্ডের মতে, তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার বদলে নিজেরাই হামলা চালাতে চাইবে; আর সেটি সম্ভবত জিসিসির যৌথ বাহিনী পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের মতো কাঠামোর মাধ্যমে। ১৯৮৪ সালে গঠিত এ যৌথ বাহিনী ২০১৩ সালে একীভূত সামরিক কমান্ডে রূপ নেয়। তার ভাষায়, তারা ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে এমন ধারণা তৈরি করতে চায় না; বরং নেতৃত্ব দিচ্ছে এই ভাবমূর্তিই চাইবে। আছে দুঃস্বপ্নের আশঙ্কাও যুদ্ধ ও সংঘাতের তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। মনিকা মার্কস ‘সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কার কথা বলেন। তার মতে, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও লবণমুক্ত পানি ছাড়া প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক উপসাগরীয় দেশগুলো কার্যত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। আর জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। অন্যদিকে পিনফোল্ডের মতে, শারীরিক ক্ষতির চেয়েও বড় হুমকি তাদের সুনামের ওপর আঘাত। অস্থির অঞ্চলে বিনিয়োগ ও পর্যটনের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে যে ব্র্যান্ড তারা এতোদিন ধরে তৈরি করেছিল, ইরানের এ হামলা তাতে বেশ ধাক্কা দিয়েছে। রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সরাসরি যুদ্ধের নতুন অধ্যায়? বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতোদিন উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ ছিল ইয়েমেনের হুতি বা লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো অ-রাষ্ট্রীয় পক্ষকে ঘিরে। এখন চিত্র বদলেছে। পিনফোল্ড বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে হয়তো রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে সরাসরি যুদ্ধের এক নতুন ধারা, কিংবা পুরোনো ধারায় প্রত্যাবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভ্রান্তি ছড়ানো বা প্রক্সি যুদ্ধের বদলে সরাসরি সংঘাতের মাত্রা বেড়েছে। মনিকা মার্কস বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ইসরায়েলকে ইরানের চেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখত, বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই মূল্যায়ন বদলে গেছে। তার মতে, ইরানের প্রথম দফার হামলা ছিল ব্যাপক ও উদ্বেগজনকভাবে ছড়ানো। সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এ মুহূর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো দ্রুত তাদের কৌশল পুনর্গঠন করছে। তারা পরিস্থিতির বাইরে থাকতে চাইলেও, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত বহুতল ভবনগুলো হয়তো সেই সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত করে আনছে।