কয়েক সপ্তাহের বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হওয়ার মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে তেহরান জানিয়েছে, মার্কিন চাপ ও সামরিক হামলার বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। সোমবার ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নেবে। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত করব। দেশটিকে জবাব দেওয়া হবে।’ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অবশ্য ট্রাম্প তা নাকচ করেন। সোমবার ওভাল অফিসে এক সাংবাদিক তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ইরান সামরিকভাবে পরাজিত অবস্থায় রয়েছে; এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবার প্রশ্নই আসে না। প্রশ্নটিকে তিনি ‘স্টুপিড প্রশ্ন’ বলেও মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, তেহরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করতে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য চাপের কৌশল চালিয়ে যাবে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে চলা ওই সংঘাতের পরও দুই পক্ষের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ নিয়ন্ত্রণের অবস্থানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরান নতুন করে সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর গত রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। এর পরই ট্রাম্প আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেন। তবে তেহরানের অবস্থানও কঠোর। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে। তাঁর দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে শুরু করা সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘আটকে পড়েছে’। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে অংশ নেওয়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও আলোচনার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতায় ফিরে এলে ইরানও একই পথে ফিরতে প্রস্তুত। বিশকেকে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থনের কথাও স্পষ্ট হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের জনগণ যে লড়াই করছে, তাতে রাশিয়া তাদের পাশে রয়েছে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে এসসিও। সম্মেলন শেষে প্রকাশিত ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এদিকে নতুন করে সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ১৮ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৬৭ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ২৭ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৭ দশমিক ০৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকির পাশাপাশি সংঘাতটি আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।