প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইরান যুদ্ধবিরতি: বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তির কারণ


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইরানের পতাকা হাতে রাজধানী তেহরানে দেশটির নাগরিকরা। ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধকে ঘিরে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বাংলাদেশে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এতে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কমেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালির পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া তাৎক্ষণিকভাবে বড় স্বস্তি। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর গতি ফিরে এসেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এক লাখ টন জ্বালানি বহনকারী একটি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার, যা ৩ মার্চ থেকে সৌদি আরবের একটি বন্দরে আটকে ছিল, এখন বাংলাদেশের পথে রয়েছে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল, পরিবহন খরচ বেড়েছিল এবং দেশের জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিশ্ববাজারেও ইরান যুদ্ধবিরতির দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৬ শতাংশের বেশি কমে এশিয়ার প্রাথমিক লেনদেনে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৭০ ডলারে নেমে আসে, যা আগের দিনের ১০৯ দশমিক ২৭ ডলার থেকে অনেক কম। হরমুজ খুলতেই জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুফল হলো বিলম্বিত জ্বালানি চালান পুনরায় শুরু হওয়া। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আটকে থাকা চালান দ্রুত দেশে আনার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে জোর প্রচেষ্টা চলছে। জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন উইং) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, "আমাদের জ্বালানি আমদানি মূলত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধবিরতি আমাদের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস এনে দিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও এলএনজি সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত সরবরাহ পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছি।" একই পরিমাণ অপরিশোধিত তেল বহনকারী আরেকটি ট্যাংকার এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে তৃতীয় একটি চালান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, কারণ সরবরাহকারী আগের বিঘ্নের কারণে 'ফোর্স মাজ্যুর' ঘোষণা করেছে। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকারী ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড কাঁচামালের ঘাটতির কারণে আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। প্রতিষ্ঠানটি পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও ন্যাফথা উৎপাদন করে, যা দেশের জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে। মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, "এক লাখ টন এরাবিয়ান লাইট ক্রুড তেল আসায় ইস্টার্ন রিফাইনারির কার্যক্রম চালু থাকবে এবং সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য স্থিতিশীল হবে।" সাধারণত, প্রতি এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করলে ১৫-২০ শতাংশ অকটেন ও পেট্রল, এবং ৩০-৩৫ শতাংশ ডিজেল পাওয়া যায়, যা দেশের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমবে আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দামের কারণে এলএনজি ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে সরকার এর আগে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ করেছিল। যুদ্ধবিরতি ঘোষণায় তেলের দাম কমায় এই চাপও কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য হলেও, এটি কতটা স্থায়ী হবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি কতদিন স্থায়ী হয় এবং বৈশ্বিক বাজার কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় তার ওপর।" দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারীদের 'ফোর্স মাজ্যুর' ঘোষণার কারণে পেট্রোবাংলাকে এপ্রিল ও মে মাসে ২২টি কার্গো আমদানিতে অতিরিক্ত সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এলএনজি বাজারে স্বস্তি আসতে দেরি এদিকে তেলের বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও, কাঠামোগত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও চুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এলএনজি খাতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলবে না বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আরফানুল হক বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীরা ১৮ মে পর্যন্ত 'ফোর্স মাজ্যুর' বহাল রেখেছে, ফলে এর আগে এসব চুক্তির আওতায় কোনো কার্গো আসবে না। তিনি বলেন, "সরবরাহ পুনরায় শুরু হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি উভয় চুক্তিতে বিদ্যমান বিলম্বিত মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার কারণে আমাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।" তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, "এপ্রিলের কার্গো পেলেও দাম নির্ধারিত হবে মার্চের দামের ভিত্তিতে, যখন বাজার অনেক চড়া ছিল।" দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিগুলো সাধারণত তিন মাসের গড় ব্রেন্ট ক্রুডের দামের ওপর নির্ভরশীল। ফলে জুন-জুলাইয়ের আমদানির দাম নির্ধারিত হবে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসের গড় দামে—যে সময়ে তেলের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। তিনি বলেন, "এলএনজির দাম স্পট মার্কেটে দাম কমলেও—দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ব্রেন্ট এর উচ্চ গড় দামের প্রভাব থাকবে।" এর ফলে স্পট মার্কেটে এলএনজি সস্তা হলেও—চুক্তিভিত্তিক সরবরাহে তুলনামূলক বেশি দামে পড়তে পারে, যা বিশ্ববাজারে দাম কমার কারণে পাওয়া স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সুবিধাকে সীমিত করবে। পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বস্তি যুদ্ধবিরতির ফলে দেশের পরিবহন ও লজিস্টিক খাতেও স্বস্তি ফিরেছে, যা আগে সংঘাতের কারণে চাপে ছিল। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, "যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছিল। ফলে বিমার প্রিমিয়াম ও ফ্রেইট চার্জও (জাহাজে মালবহনের ভাড়া) অনেক বেড়ে যায়।" ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৮-২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ হাজার টাকার বেশি হয়েছিল। উত্তেজনা কমায় এসব খরচ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যদিও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। ব্যবসায়ীরা যুদ্ধবিরতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক রয়েছেন। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, "যুদ্ধের কারণে স্পট মার্কেটে এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে দাম ইতোমধ্যেই ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি এই সংকট হয়তো কিছুটা কমাবে।" বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে শিল্পখাতের কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, "স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে আমাদের রপ্তানি বাজারও উন্নতি করবে।" বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, জ্বালানির দাম কমা উৎসাহব্যঞ্জক হলেও অনিশ্চয়তা এখনও রয়ে গেছে। তিনি বলেন, "এটি ইতিবাচক লক্ষণ, কারণ জ্বালানির দাম ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। তবে এই পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে তা বলা কঠিন।" এক্ষেত্রে তিনি বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অনিশ্চিত প্রকৃতির কথাও উল্লেখ করেন। এশিয়ান অ্যান্ড ড্যাফ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক বিজিএমইএ নেতা এম এ সালাম যুদ্ধবিরতিকে অনিশ্চয়তা থেকে সতর্ক স্থিতিশীলতার দিকে অগ্রযাত্রা হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, যুদ্ধবিরতির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর থাকা বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক অনেকটাই কেটে গেছে। তিনি বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়ামের দাম কমলে আমাদের আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে আমাদের লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক চাপ কমবে।" সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও শওকত আলী খান বলেন, "যুদ্ধের কারণে লেনদেনের ভারসাম্য, জ্বালানি সংকট এবং ডলারের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির ফলে তা অনেকাংশে প্রশমিত হবে।" হরমুজ প্রণালি দিয়ে কাঁচামাল আমদানিকারক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানায়, তাদের অনেক পণ্যবোঝাই জাহাজ সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে, যা খালাস করা সম্ভব হয়নি। গ্রুপটির চেয়ারম্যান আহসান খান বলেন, "১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যমুখী যেসব রপ্তানি জাহাজ আটকে ছিল, সেগুলো খালাস করতে পারব বলে আমরা আশা করছি।" রেনাটা পিএলসির সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কাইসার কবির বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রায় দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি আমাদের জন্য সাময়িক স্বস্তি হিসেবে কাজ করছে। আমরা দ্রুত রপ্তানি চালান পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি এবং কাঁচামাল দ্রুত আনার চেষ্টা চলছে।" বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের মহাসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমরা যুদ্ধবিরতি নিয়ে আশাবাদী। কারণ জ্বালানির দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপের কারণে, গত কয়েক সপ্তাহে বিশ্ববাজারে ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের দামও ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।"