প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইরান যুদ্ধের ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি? প্রকাশ্য হিসাব নিয়ে প্রশ্ন


সংযুক্ত ছবি

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ব্যয় নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ এক মূল্যায়নে যুদ্ধ পরিচালনায় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় **৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার** হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অঙ্ক ওয়াশিংটনের প্রকাশ্যে দেওয়া হিসাবের প্রায় তিন গুণ বেশি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম **এনবিসি নিউজ** ছয়টি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এসব সূত্রের মধ্যে তিনজন বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ প্রাক্কলনে যুদ্ধ পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয়, ধ্বংস হওয়া সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক স্থাপনা পুনর্নির্মাণের খরচ যুক্ত করার পর মোট ব্যয় ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরানি হামলায় বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি **ইউএস নেভাল ফোর্সেস সেন্ট্রাল কমান্ড (NAVCENT)** ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম প্রধান এই ঘাঁটির সদরদপ্তর, জেটি, গুদাম, সামরিক আবাসনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে প্রায় **এক বিলিয়ন ডলার** ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন শেষ না হওয়ায় প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর না হওয়া এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের নতুন করে হামলার কারণে ভবিষ্যতে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে, সরকারি হিসাবের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের বড় ধরনের অমিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগে অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেটের পরিচালক রাসেল ভট কংগ্রেসে জানান, যুদ্ধ পরিচালনায় প্রায় **৩০ বিলিয়ন ডলার** ব্যয় হয়েছে। এরও আগে পেন্টাগনের কম্পট্রোলার জে হার্স্ট কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধের ব্যয় ২৯ বিলিয়ন ডলার। তবে প্রায় ছয় সপ্তাহের অতিরিক্ত যুদ্ধ পরিচালনার পরও সরকারি হিসাব প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, কংগ্রেসের কাছে সম্প্রতি হোয়াইট হাউস **৮৮ বিলিয়ন ডলারের সম্পূরক বাজেট** অনুমোদনের আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রায় **৭২ বিলিয়ন ডলার** যুদ্ধ-সংক্রান্ত ব্যয়ের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই প্রস্তাবই সরকারি ঘোষিত ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অসঙ্গতি স্পষ্ট করে। এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য প্রশাসন প্রকাশ করছে না। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখাচ্ছেন কিংবা বিভিন্ন ব্যয় সরকারি হিসাবের বাইরে রাখছেন। অন্যদিকে, স্বাধীন গবেষকরাও প্রায় একই ধরনের ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরেছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষক **স্টিভেন সেমলার** সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে দাবি করেছেন, যুদ্ধের মোট ব্যয় ইতোমধ্যে **১০৩ বিলিয়ন ডলার** অতিক্রম করেছে। তার হিসাব অনুযায়ী, অস্ত্র ও গোলাবারুদে ব্যয় হয়েছে ৪৭ বিলিয়ন ডলার, সামরিক অভিযান পরিচালনায় ২৯ বিলিয়ন ডলার, ধ্বংস হওয়া সামরিক সম্পদ প্রতিস্থাপনে ২০ বিলিয়ন ডলার, ইসরায়েলের বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সহায়তায় ৩ বিলিয়ন ডলার এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার যুদ্ধ-সম্পর্কিত ব্যয়ে আরও ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। সেমলারের ভাষায়, এই ব্যয় বিশ্বের মাত্র তিনটি দেশের বার্ষিক সামরিক বাজেট ছাড়া বাকি প্রায় সব দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে এবং ৩০ বিলিয়ন ডলারের সরকারি হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোক্তাদের অতিরিক্ত প্রায় **৬৯ বিলিয়ন ডলার** ব্যয় করতে হয়েছে বলে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় নিয়ে বাড়তে থাকা বিতর্কের মধ্যেও ট্রাম্প প্রশাসন এখনও ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে যুদ্ধের প্রকৃত আর্থিক ব্যয়, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও নীতিগত বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।