প্রকাশ :: ... | ... | ...

ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর অবস্থানের গোপন তথ্য তুলে ধরছে চীনা কোম্পানিগুলো


সংযুক্ত ছবি

ইংল্যান্ডের একটি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করছে মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি বি-৫২ স্ট্রাটোফোট্রেস বোমারু বিমান। ছবি: এএফপি

উন্মুক্ত উৎসের তথ্য—যেমন ফ্লাইট ট্র্যাকার, স্যাটেলাইট ছবি ও জাহাজ চলাচলের তথ্য—ব্যবহার করে বাজারভিত্তিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ তৈরি করা নতুন নয়। তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান এআই সক্ষমতা এসব সরঞ্জামকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে, ফলে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মার্কিন সামরিক গতিবিধি গোপন রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর পাঁচ সপ্তাহ পর পশ্চিমা ও চীনা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভাইরাল পোস্ট শনাক্ত করেন বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা। এসব পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর সরঞ্জাম, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর গতিবিধি এবং তেহরানে হামলার প্রস্তুতিতে যুদ্ধবিমান কীভাবে মোতায়েন করা হচ্ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই গোয়েন্দা তথ্য আসছে দ্রুত বিকাশমান এক নতুন বাজার থেকে: চীনা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো—যাদের কেউ কেউ চীনের সামরিক বাহিনী বা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-র সঙ্গেও সম্পৃক্ত, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্মুক্ত উৎসের তথ্য একত্র করে এমন বিশ্লেষণ তৈরি করছে—যা তাদের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর গতিবিধি "উন্মোচন" করতে সক্ষম হচ্ছে। চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান যুদ্ধে সম্পৃক্ততা থেকে দূরে থাকছে। কিন্তু, গত পাঁচ বছরে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান এই ধরনের তথ্য বিক্রির নতুন বাজার তৈরি করছে। চীনের 'সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন' কৌশলের আওতায় প্রতিরক্ষাখাতে ব্যবহারযোগ্য এআই প্রযুক্তি উন্নয়নে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে ইতোমধ্যে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। গত মাসে এ খাতকে আরও জোরদার করতে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন উদ্যোগও ঘোষণা করা হয়েছে। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। উন্মুক্ত উৎসের তথ্য—যেমন ফ্লাইট ট্র্যাকার, স্যাটেলাইট ছবি ও জাহাজ চলাচলের তথ্য—ব্যবহার করে বাজারভিত্তিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ তৈরি করা নতুন নয়। তবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান এআই সক্ষমতা এসব সরঞ্জামকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে, ফলে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে মার্কিন সামরিক গতিবিধি গোপন রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মার্কিন থিঙ্কট্যাঙ্ক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ফেলো রায়ান ফেদাসিউক বলেন, "চীনে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক দক্ষ বেসরকারি জিওস্পেশাল বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে এবং সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর মোকাবিলার সক্ষমতা জোরদার করবে।" ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হাংঝৌভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মিজারভিশন এ ধরনের অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান, যা পশ্চিমা ও চীনা উভয় উৎসের তথ্যকে এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির কার্যক্রম, নৌ চলাচল এবং নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান ও সংখ্যা শনাক্ত করার দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি চীনা সামরিক বাহিনীর অংশ নয়, তবে পিএলএ-কে সেবা দেওয়ার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় ন্যাশনাল মিলিটারি স্ট্যান্ডার্ড সনদ রয়েছে। তাদের প্রকাশিত কিছু ছবি—যা চীনা ও পশ্চিমা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর জড়ো হওয়ার চিত্র তুলে ধরে, বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বা 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরুর আগে। এতে ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের গতিবিধিও দেখানো হয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের ওভদা বিমানঘাঁটি, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিস্তারিত তথ্যও তুলে ধরা হয়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে, "২০২৬ সালে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে আমরা দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনকৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের অবস্থান শনাক্ত করেছি" এবং মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর জ্বালানি ভরার ধরণও "উন্মোচন" করেছি। এছাড়া তারা দাবি করেছে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার মার্কিন অভিযানের আগাম গতিবিধি তারা "মাস কয়েক আগেই" শনাক্ত করেছিল এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহন কার্যক্রম "রিয়েল-টাইমে" বা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার সামর্থ্যও তাদের আছে। মিজারভিশন তাদের গ্রাহকদের তালিকা প্রকাশ করে না এবং মন্তব্যের অনুরোধেও সাড়া দেয়নি। তারা তাদের তথ্যের উৎসও প্রকাশ করে না—যার মধ্যে স্যাটেলাইট ছবি, এডিএস-বি ফ্লাইট ডেটা এবং জাহাজের এআইএস ডেটা অন্তর্ভুক্ত—তবে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও অনলাইন বিশ্লেষণ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, তারা চীনা ও পশ্চিমা উভয় উৎস ব্যবহার করে। তাদের প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কিছু বাণিজ্যিক সরবরাহকারীর ছবি থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেমন ইউরোপীয় বিমাননির্মাতা এয়ারবাস এবং স্যাটেলাইট কোম্পানি ভ্যানটর এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আগেই জানিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি প্লানেট ল্যাবস-এর ছবিও ব্যবহার করেছে। তবে কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান সরাসরি তাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়; কারণ অধিকাংশ বড় সরবরাহকারী এমন ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার নীতি অনুসরণ করে। ভ্যানটর-এর একজন মুখপাত্র দাবি করেন, তাদের কোম্পানি কোনো চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্যাটেলাইট ছবি বিক্রি করে না এবং সংঘাত চলাকালে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এর মধ্যে রয়েছে এমন এলাকায় ছবি সরবরাহ সীমিত করা, "যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও মিত্র বাহিনী সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিংবা যেখানে প্রতিপক্ষ তাদের ওপর সক্রিয়ভাবে হামলার লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করছে।" মার্কিন কর্মকর্তা ও সাবেক গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম—এমন দাবির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তবে তারা সতর্ক করেছেন, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের উত্থান উদ্বেগজনক। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, "এখনো হয়তো সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি, তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো তাদের উদ্দেশ্য।" বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে চীনের সীমাবদ্ধতা ইঙ্গিত দেয় যে এসব প্রতিষ্ঠানের দাবি অতিরঞ্জিত হতে পারে—বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরোকে আটক করার মার্কিন অভিযানের সময় বেইজিং অপ্রস্তুতই ছিল। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ফরেন সার্ভিসের সিনিয়র ফেলো ডেনিস ওয়াইল্ডার বলেন, "চীনা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চাপ অনুভব করছে। এর একটি প্রতিক্রিয়া হলো—এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনে এনে বলা, তারা মধ্যপ্রাচ্যে সব মার্কিন যুদ্ধবিমানের গতিবিধি দেখতে পাচ্ছে।" তবু এ প্রবণতা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়না এক বিবৃতিতে বলেছে, "চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এআইকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের নজরদারি সরঞ্জামে পরিণত করছে। এই হুমকি তাত্ত্বিক নয়, বরং এটা তাৎক্ষণিক।" চীনের হাংঝৌভিত্তিক আরেকটি প্রতিষ্ঠান জিংগান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। 'অপারেশন এপিক ফিউরি'র শুরুর সময় দুটি মার্কিন বি-২এ স্টেলথ বোমারু বিমানের মধ্যে যোগাযোগের একটি রেকর্ড প্রকাশের দাবিও করেছে তারা। রায়ান ফেদাসিউক বলেন, তার ধারণা জিংগান টেকনোলজি চীনের পরিচালিত জিলিন স্যাটেলাইট কনস্টেলেশনের মতো উৎস থেকে বিপুল পরিমাণ স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করছে, যা তারা বিশ্লেষণে ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিজার ভিশন এবং জিংগান টেকনোলজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বেইজিংকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত না হয়েও মিত্রদের সহায়তা করার একটি 'সম্ভাব্য অস্বীকারযোগ্য' সুযোগ করে দিচ্ছে। রায়ান বলেন, "যেকোনো রাষ্ট্র তার বেসরকারি খাতের উদ্ভাবন থেকে লাভবান হতে পারে এবং একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের দায় এড়িয়ে যেতে পারে—এমনকি তারা রাষ্ট্রের নির্দেশনায় কাজ করলেও।" চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ইরানের তেলের বড় ক্রেতাও বেইজিং। তবে চীন নিজেকে শান্তিপ্রিয় বিশ্বশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে এই যুদ্ধে সরাসরি জড়ানো থেকে বিরত থাকছে। এ সপ্তাহে পাকিস্তানের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার জন্য ইরানকে লক্ষ্যভিত্তিক তথ্য সরবরাহ করছে—যা কোনো বড় প্রতিপক্ষের এই যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রথম ইঙ্গিত দেয়। এরপরেই চীনের বিষয়ে একই দাবি তুললো প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।