প্রকাশ :: ... | ... | ...

‘ইসলামবিরোধী’ দাবি, আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ করল তালেবান


সংযুক্ত ছবি

আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে তালেবান সরকার। এ চিকিৎসাপদ্ধতিকে ‘ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থি’ দাবি করে অস্ত্রোপচার বন্ধ রাখতে চিকিৎসকদের মৌখিকভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির চক্ষু বিশেষজ্ঞরা। এতে প্রতিবছর শত শত মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের সংঘাত, বিস্ফোরণ ও দুর্ঘটনায় চোখের কর্নিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া রোগীরা পড়েছেন অনিশ্চয়তায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। চিকিৎসকদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, তালেবান কর্তৃপক্ষ কর্নিয়া প্রতিস্থাপনকে ইসলামি শিক্ষার বিরোধী বলে উল্লেখ করে এ চিকিৎসা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে লিখিত কোনো সরকারি আদেশের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। কাবুলের নূর আই হাসপাতালের চিকিৎসক নূর জামান হাশিম জানান, তালেবানের মৌখিক নির্দেশের পর তাঁদের হাসপাতালে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কয়েক দশকের সংঘাত আফগানিস্তানের স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চক্ষু বিশেষজ্ঞ নেই। স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় কর্নিয়া সংগ্রহ করাও কঠিন। নূর জামান হাশিমের ভাষ্য, তালেবানের নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে চিকিৎসকদের পক্ষে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অস্ত্রোপচার চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কর্নিয়া হলো চোখের সামনের স্বচ্ছ অংশ, যার মধ্য দিয়ে আলো চোখের ভেতরে প্রবেশ করে। রোগ, আঘাত বা সংক্রমণে এই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত কর্নিয়ার পরিবর্তে দাতার কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা সম্ভব। আফগানিস্তানে সংঘাত ও বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পাওয়া বহু মানুষের জন্য এ চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। বিনামূল্যের চিকিৎসা কর্মসূচি স্থগিত আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কর্মসূচি সম্প্রসারণে কাজ করছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়ভিত্তিক সামাজিক সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব ফিজিশিয়ানস অব পাকিস্তানি ডিসেন্ট অব নর্থ আমেরিকা (এপিপিএনএ)। সংস্থাটি বিনামূল্যে কর্নিয়া সরবরাহের পাশাপাশি আফগান চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল। এপিপিএনএর কর্নিয়া কর্মসূচির প্রধান ফাওয়াদ জাফর বলেন, ২০১৭ সাল থেকে সংস্থাটি পাকিস্তানে বিনামূল্যে কর্নিয়া সরবরাহ করে আসছে। এ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন। প্রায় চার মাস আগে আফগানিস্তানেও কর্মসূচিটি সম্প্রসারণ করা হয়। সেখানে শত শত মানুষের কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন ছিল। ফাওয়াদ জাফরের মতে, তালেবানের নির্দেশে আফগানিস্তানে এ উদ্যোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে যেসব রোগী বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের চিকিৎসা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কয়েক দশকের সংঘাতে বিধ্বস্ত আফগানিস্তানে এ চিকিৎসাসেবার ব্যাপক প্রয়োজন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধ হয়ে গেলে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় রোগীরা তালেবানের নির্দেশের প্রভাব পড়েছে চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ওপরও। কাবুলে গ্যাসের বিস্ফোরণে দৃষ্টিশক্তি হারানো ব্যবসায়ী সালামাত খান বিনামূল্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের সুযোগের কথা জানতে পেরে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। চিকিৎসকেরা তাঁকে সেপ্টেম্বরে অস্ত্রোপচারের সময় দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আগস্টে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। সালামাত খান জানান, বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগের কথা শুনে তিনি আশাবাদী হয়েছিলেন। অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই পরিস্থিতির মুখোমুখি জালালাবাদের ৪০ বছর বয়সী খাদিজা বেগম। বিস্ফোরণে চোখে আঘাত পাওয়ার পর তিনি জালালাবাদ চক্ষু হাসপাতালে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন। কিন্তু গত মাসে তালেবান কর্তৃপক্ষ ইসলামি শিক্ষার বিরোধী দাবি করে এ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয় বলে জানান তিনি। আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার মধ্যে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন বন্ধের সিদ্ধান্ত রোগীদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও প্রতিস্থাপনের উপযোগী কর্নিয়ার ঘাটতি আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা যুক্ত হওয়ায় দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তালেবান সরকারের এ নির্দেশের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বা লিখিত নীতিমালার তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তবে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, নির্দেশটি কার্যকর থাকলে আফগানিস্তানে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের অপেক্ষায় থাকা বহু রোগী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।