ইসলামাবাদের আকাশ তখন শান্ত। হঠাৎ একের পর এক বিকট শব্দে কেঁপে উঠল শহর। অনেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। কোথাও বিস্ফোরণ ঘটেছে কি না, শুরু হলো উৎকণ্ঠা। পাকিস্তানের কয়েকটি শহরেও শোনা গেল সেই অস্বাভাবিক শব্দ। পরে জানা গেল, বোমা নয়—আকাশের অনেক ওপরে শব্দের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি গতিতে ছুটে চলা একটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান তৈরি করেছিল সেই শব্দ। সেটি ছিল মিগ-২৫—ন্যাটোর দেওয়া নাম ‘ফক্সব্যাট’। ঘটনাটি ১৯৯৭ সালের ২৭ মে। এত বছর পরও সামরিক ইতিহাসে ঘটনাটি রহস্যময়। কারণ, সেদিন ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে অস্বীকার করেছিল পাকিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ। কিন্তু প্রায় তিন দশক পর সেই সময়ের ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক দুই কর্মকর্তা জানালেন, গল্পটির মূল অংশ সত্য। একটি ভারতীয় মিগ-২৫ সত্যিই পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকেছিল এবং প্রায় ৬৫ হাজার ৬১৭ ফুট বা ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার বেগে উড়েছিল। সাবেক উইং কমান্ডার প্রদীপ জাসওয়ান্ত ‘পিজে’ ঠাকুর, যিনি তখন ১০২ স্কোয়াড্রন ‘ট্রাইসনিকস’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সম্প্রতি এনডিটিভির এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মিগ-২৫ পাকিস্তানের আকাশসীমায় গিয়েছিল—এটি সত্য। তবে প্রচলিত গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তিনি সংশোধন করেছেন। তাঁর ভাষ্য, পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে সনিক বুম তৈরি করার জন্য বিমানটি অতিরিক্ত গতি নেয়নি। ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় মিগ-২৫কে ধীরগতিতে ওড়ানোই বরং সম্ভব ছিল না। ইসলামাবাদের মানুষ যে বিকট শব্দ শুনেছিলেন, সেটি ছিল সুপারসনিক গতিতে উড়ে যাওয়া বিমানের তৈরি সনিক বুম। মাটিতে দাঁড়িয়ে এমন শব্দ অনেক সময় বিস্ফোরণের মতোই শোনায়। ভারতীয় বিমানটি তখন প্রায় ম্যাক ২.৪ গতিতে চলছিল। সাবেক এয়ার মার্শাল সুমিত মুখার্জির ভাষ্যেও, সেদিন পাকিস্তানের আকাশে মিগ-২৫ ছাড়া আর কোনো বিমান ছিল না; ফলে ঘটনাটি ঘিরে পরবর্তী সময়ে নানা গল্প তৈরি হয়। আকাশে ধরা পড়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে মিগ-২৫ ছিল শীতল যুদ্ধের সময়কার সবচেয়ে দ্রুতগামী সামরিক বিমানের একটি। যুক্তরাষ্ট্রের এসআর-৭১ ব্ল্যাকবার্ডের সঙ্গে এটি এমন কয়েকটি বিমানের মধ্যে ছিল, যেগুলো প্রায় ম্যাক ৩ গতিতে উড়তে পারত। ভারত ১৯৮১ সালে মিগ-২৫ ব্যবহার শুরু করে। ১০২ স্কোয়াড্রন ‘ট্রাইসনিকস’-এ ছিল অল্পসংখ্যক এই বিশেষ গোয়েন্দা বিমান। ১৯৯৭ সালের সেই মিশনে পাকিস্তানের বিমানবাহিনী অনুপ্রবেশকারী বিমান শনাক্ত করেছিল। এফ-১৬ পাঠানোর কথাও পরবর্তী বিবরণে উঠে এসেছে। কিন্তু মিগ-২৫-এর উচ্চতা ও গতি এতটাই বেশি ছিল যে সেটিকে বাধা দেওয়ার আগেই বিমানটি মিশন শেষ করে পাকিস্তানের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে যায়। প্রায় ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে থাকা বিমান এক মিনিটে প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারত। এই বিমান যুদ্ধ করার জন্য নয়, মূলত তথ্য সংগ্রহের জন্য তৈরি হয়েছিল। মিগ-২৫-এর নাকে বসানো ক্যামেরার সাহায্যে পাকিস্তান ও চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি তোলা হতো। শিল্পাঞ্চল, রেলপথ, নতুন নির্মাণকাজ কিংবা অন্যান্য কৌশলগত স্থাপনা—এসব ছিল গোয়েন্দা নজরদারির লক্ষ্য। একটি ক্যামেরা সরাসরি নিচের ভূমির ছবি তুলত এবং সেখান থেকে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ নির্ধারণ করা যেত। ক্যামেরার সরঞ্জামও ছিল বিশাল। সাবেক কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্যামেরা প্যাকেটের আকার প্রায় একটি সোফার সমান এবং ব্যবহৃত ফিল্ম রোল ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩২ ইঞ্চি চওড়া। মিশনের আগে-পরে এসব সরঞ্জাম নিয়ে ছিল কঠোর গোপনীয়তা। কখন বিমান উড়বে, কোথায় যাবে—এসব তথ্য সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তাই জানতেন। কারগিলে বদলে গেল মিশন ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ মিগ-২৫-এর জন্য তৈরি করেছিল এক ভিন্ন অধ্যায়। সাধারণত প্রায় ২০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে উড়ত বিমানটি। কিন্তু কারগিলের পাহাড়ি এলাকায় পাথরের আড়ালে থাকা ছোট তাঁবু কিংবা বাংকার এত উঁচু থেকে ক্যামেরায় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ঝুঁকি নিয়ে বিমানটিকে অনেক নিচে নামানো হয়। উইং কমান্ডার পিজে ঠাকুরের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায়, অর্থাৎ পাহাড়ের চূড়া থেকে আনুমানিক ৫ কিলোমিটার ওপরে উড়ে লক্ষ্যবস্তুর ছবি তোলেন। গতি নামিয়ে আনা হয় প্রায় ম্যাক ০.৯৫-এ। এটি মিগ-২৫-এর স্বাভাবিক ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। এত নিচে ও ধীরগতিতে উড়লে বিমানের সেই প্রধান নিরাপত্তা—অবিশ্বাস্য উচ্চতা ও গতি—দুটিই কমে যায়। ফলে ভারতীয় বিমানবাহিনী মিগ-২৫-এর সুরক্ষায় মিরাজ ২০০০ ও মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানকে নিয়োজিত করে। এই গোয়েন্দা ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে কারগিলে ভারতীয় বিমান হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এবার যুদ্ধ নয়, সূর্যকে তাড়া মিগ-২৫-এর গল্প শুধু গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা যুদ্ধের নয়। ১৯৯৫ সালের ২৪ অক্টোবর পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় ভারতীয় বিজ্ঞানীদের জন্য বিমানটি নেমেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূমিকায়। উদয়পুর সোলার অবজারভেটরির বিজ্ঞানীদের সহায়তায় মিগ-২৫ প্রায় ৮০ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে সূর্যগ্রহণের ছায়াকে অনুসরণ করে। ভারতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার নথিতে এই অভিযানের উল্লেখ রয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে থেকে সূর্যের করোনা পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলা। মাটিতে পূর্ণগ্রাসের সময় ছিল খুবই অল্প। কিন্তু আকাশে দ্রুতগতির মিগ-২৫ চাঁদের ছায়াকে অনুসরণ করায় বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান। এই অভিযান মিগ-২৫-এর আরেকটি অপ্রত্যাশিত ব্যবহারকে সামনে এনেছিল—যুদ্ধের আকাশযান হয়ে ওঠা বৈজ্ঞানিক গবেষণার সহযাত্রী। স্যাটেলাইট এসে বদলে দিল সবকিছু কিন্তু প্রযুক্তি বদলে দিল মিগ-২৫-এর গুরুত্ব। একসময় শত্রু দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছবি তুলতে এমন একটি বিমান প্রয়োজন ছিল, যা প্রচলিত যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার নাগালের বাইরে গিয়ে কাজ করতে পারে। পরে উপগ্রহচিত্র, মনুষ্যবিহীন আকাশযান ও উন্নত গোয়েন্দা প্রযুক্তি সেই প্রয়োজন অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীতে প্রায় ২৫ বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০০৬ সালের ১ মে মিগ-২৫ অবসর নেয়। ‘ফক্সব্যাট’ আর আকাশে ছুটে যায় না। কিন্তু এর রেখে যাওয়া গল্পগুলো এখনো সামরিক ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর অধ্যায় হয়ে আছে। আর ইসলামাবাদের সেই বিকট শব্দ? বহু বছর সেটি ছিল রহস্য, পরে হয়ে ওঠে কিংবদন্তি। ভারতের সরকারি অস্বীকৃতির আড়ালে থাকা মিশনের সত্যতা এখন সাবেক পাইলটদের বর্ণনায় অনেকটাই স্পষ্ট। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনটি হয়তো এখানেই—সেদিনের সনিক বুম পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে শক্তি প্রদর্শনের কোনো পরিকল্পিত কৌশল ছিল না; বরং আকাশের সীমা, বিমানের গতি আর একটি গোপন গোয়েন্দা মিশনের স্বাভাবিক পরিণতিই সেটিকে মাটির মানুষের কাছে বিস্ফোরণের শব্দে পরিণত করেছিল।