ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর), ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রাজপথে নেমেছে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির আন্দোলন ঘিরে দিল্লি, মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে কখনো সরাসরি বিক্ষোভে, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন চলচ্চিত্র ও বিনোদনজগতের পরিচিত মুখেরা। শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, প্রকাশ রাজ, বিশাল দাদলানি ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির অংশগ্রহণের পর এবার মুম্বাইয়ে আটক হয়েছেন অভিনেতা ইমরান খান। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে সিজেপির বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও ধরপাকড় চালায় পুলিশ। একই দিনে মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দান ও আশপাশের এলাকায় আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বলিউড অভিনেতা ইমরান খান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে কয়েক শ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। আটকের পর পুলিশের গাড়ির ভেতর থেকে তোলা একটি সেলফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন ইমরান। ছবির সঙ্গে রসিকতার সুরে তিনি লেখেন, ‘দেখা যাচ্ছে, আমাকে গাড়িতে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ সিজেপির কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানাতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। মুম্বাই পুলিশ জানিয়েছে, আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য অনুমতি নেওয়া হয়নি। পুলিশের ভাষ্য, বোম্বে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিক্ষোভের জন্য অনুমোদিত স্থান আজাদ ময়দান। অন্যদিকে, আয়োজকদের দাবি, তাঁরা ই-মেইলে পুলিশের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো উত্তর পাননি। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মতবিরোধ দেখা দেয়। মুম্বাইয়ে শাবানা-নাসিরুদ্দিন, বেঙ্গালুরুতে প্রকাশ রাজ সিজেপির আন্দোলনে চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখদের অংশগ্রহণ শুরু হয় অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই। গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী শাবানা আজমি, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও সংগীতশিল্পী বিশাল দাদলানি। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নাসিরুদ্দিন শাহের আলিঙ্গনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ওই সমাবেশে ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়। সিজেপির দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছে দলটি। তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে—আন্দোলনকারীদের এমন অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এরপর ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে সিজেপির আরেকটি কর্মসূচিতে অংশ নেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। সেখানে আন্দোলনকারীরা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করেন। প্রকাশ রাজের বক্তব্য, এসআইআর শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে নাগরিকের মর্যাদা ও ভোটাধিকার জড়িত। ধ্রুব রাঠিও আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। তাঁদের অংশগ্রহণের ফলে কর্মসূচিটি বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় আরও বেশি জায়গা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংহতি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাতে সব তারকাকে সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়নি। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ভিডিও শেয়ার করেছেন, কেউ আবার সেসব পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। শাবানা আজমির শেয়ার করা প্রতিবাদের ভিডিও পুনরায় পোস্ট করেন অভিনেত্রী দিয়া মির্জা ও কঙ্কনা সেনশর্মা। রিচা চাড্ডা, টুইঙ্কল খান্না, জোয়া আখতার, শিবানী আখতার, তারা শর্মা সালুজা ও সাবা পাতৌদির প্রতিক্রিয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চলচ্চিত্রজগতের এসব পরিচিত মুখের অংশগ্রহণ আন্দোলনটিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে কারও উপস্থিতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াকে আন্দোলনের সব দাবি কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সিজেপির আন্দোলনটি এর আগে শিক্ষা খাতের অনিয়ম ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে আলোচনায় এসেছিল। এবার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে দলটি। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করছেন, সংশোধন প্রক্রিয়ায় যোগ্য ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন পক্ষের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না। অনুমতি নিয়ে বিরোধ, বাড়ছে ধরপাকড় ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে কর্মসূচি ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলের দুই নেতা সৌরভ দাশ ও আশুতোষ রাঙ্কাকে উড়োজাহাজের ভেতর থেকে আটক করা হয়। তাঁদের অবস্থান নিয়ে পরে উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটি। একই দিনে মুম্বাইয়েও আগস্ট ক্রান্তি ময়দান ও আশপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেখানে ইমরান খানসহ কয়েক শ বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, অনুমতি ছাড়া জমায়েত ঠেকাতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা দিয়ে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করা হচ্ছে। সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের একাংশও। তাঁদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাসংক্রান্ত যুক্তি, কর্মসূচির অনুমতির অবস্থা এবং আটকের আইনগত ভিত্তি—সব দিক বিবেচনা করেই ঘটনাগুলোর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ভোটাধিকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইমরান খানের আটক হওয়া এবং শাবানা আজমি, নাসিরুদ্দিন শাহ, প্রকাশ রাজ ও ধ্রুব রাঠির মতো পরিচিত মুখের অংশগ্রহণ সেই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। তবে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করবে সিজেপির দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থান, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তির ওপর।