প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন; এসআইআর নিয়ে বিক্ষোভের মধ্যে আটক; জাতীয় পতাকা ওড়ানোয় তরুণদের কারাগারে পাঠানো কাপুরুষোচিত কাজ, বিক্ষোভস্থল ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা কংগ্রেস নেতার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। যন্তর মন্তরে প্রবেশ এবং পুলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে মুচলেকার শর্ত লঙ্ঘন, অনধিকার প্রবেশ ও সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। খবর এনডিটিভির। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) সকালে দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রবেশের অভিযোগে সৌরভ দাস, আশুতোষ রানকা ও অজিঙ্কা শিন্ডেকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের অভিযোগ, ব্যারিকেড অতিক্রম করে তাঁরা সেখানে প্রবেশ করেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দেন। বুধবার সকাল ৮টার দিকে তাঁদের দিল্লির মন্দির মার্গ এলাকায় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয়। পরে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ তোলেন। দিল্লি পুলিশের সূত্রের দাবি, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকা এর আগেও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার মুচলেকা দিয়েছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আবারও ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের মুচলেকার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অজিঙ্কা শিন্ডেকে ব্যক্তিগত মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিজেপির আইনি দলের প্রধান রত্না সিং। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শিন্ডেকে পাঁচ হাজার রুপির ব্যক্তিগত বন্ড ও একজন জামিনদার দিতে বলা হয়েছে। আগামী ছয় মাস শান্তি বজায় রাখা এবং ভালো আচরণ নিশ্চিত করার শর্তও দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত শনিবার দিল্লিতে আরেকটি বিক্ষোভের সময় আটক হওয়ার পর সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে এক বছরের জন্য শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার মুচলেকায় মুক্তি দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। সে সময় তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার রুপির বন্ড দিতে হয়েছিল। এবার ওই মুচলেকার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিজেপির আইনি দলের প্রধান রত্না সিং এর আগে এক্সে দেওয়া পোস্টে অভিযোগ করেন, যন্তর মন্তরের ঘটনায় সৌরভ দাস, আশুতোষ রানকা ও অজিঙ্কা শিন্ডেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় আটক করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, মুচলেকার শর্ত লঙ্ঘন এবং সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, গভীর রাত পর্যন্ত তাঁদের আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। রাত ৩টার দিকে একটি ব্যক্তিগত ভ্যানে করে তাঁদের পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বুধবার দিল্লি পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৩ অক্টোবর সকালে সৌরভ দাস, আশুতোষ রানকা ও অজিঙ্কা শিন্ডেসহ সিজেপির আরও ১১ সদস্য একটি ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভেতর দিয়ে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের দাবি, ওই স্থানটি তখন নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে অনুমোদিত ছিল না। এ সময় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যরা তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা সরকারি কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেন বলে অভিযোগ পুলিশের। পরে মোট ১৪ জনকে আটক করে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং বারবার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ বিবেচনায় সৌরভ দাস, আশুতোষ রানকা ও অজিঙ্কা শিন্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদেরও একই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন বলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর বিক্ষোভের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। অন্যদিকে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। দুই পক্ষের এসব বক্তব্য ও অভিযোগের মধ্যে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের জায়গা: রাহুল গান্ধী ভারতের রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর আবারও জনগণের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর ঘটনায় তরুণদের কারাগারে পাঠানোর সমালোচনা করে তিনি বলেছেন, জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। এ কারণে তরুণদের কারাগারে পাঠানো কাপুরুষোচিত কাজ। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, শিক্ষার্থী, তরুণ, সাংবাদিক ও বিরোধী জোটের সদস্যদের ব্যানার আলাদা হলেও তাঁদের দাবি এক। তাঁরা নিজেদের সাংবিধানিক অধিকার আদায়ে বিক্ষোভ করছেন। যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের জায়গা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা এটি আবারও ফিরিয়ে নেব।’ কংগ্রেস নেতার এই বক্তব্য এসেছে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দুই নেতা আশুতোষ রানকা ও সৌরভ দাসকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর পর। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশের ব্যারিকেড অতিক্রম করে প্রবেশ, জাতীয় পতাকা ওড়ানো ও স্লোগান দেওয়ার ঘটনায় তাঁদের আটক করা হয়। পরে আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে দিল্লি কর্তৃপক্ষ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জায়গাটি দিল্লিতে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের পরিচিত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে সিজেপি ও অন্যান্য বিক্ষোভকারী সংগঠন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপও দুই নেতাকে বিচারিক হেফাজতে পাঠানোর সমালোচনা করেছেন। নিজের দেশে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কখন থেকে শান্তি ভঙ্গের অপরাধ হয়ে গেল—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি রাহুল গান্ধীর সমর্থনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই যন্তর মন্তর নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সুবিধা পাচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। রাহুল গান্ধীর পাশাপাশি আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ আরও কয়েকজন বিরোধী নেতা সিজেপির নেতাদের কারাগারে পাঠানোর সমালোচনা করেছেন। যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কে একদিকে বিক্ষোভকারীরা তাঁদের প্রতিবাদের অধিকার ও জাতীয় পতাকা ব্যবহারের স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলছেন, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তি সামনে আসছে। এর মধ্যে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।