প্রকাশ :: ... | ... | ...

এক শিক্ষকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে যেভাবে বেঁচে গেল ৯০০ শিক্ষার্থী


সংযুক্ত ছবি

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। গত ২৬ আগস্ট সকালে হিমবাহ ও ভূমিধসের কারণে উজানে আকস্মিক বন্যা শুরু হওয়ার পর মুহূর্তেই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। নদীর পানি দ্রুত নেমে আসছিল জনপদের দিকে। স্কুলের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিল পানির স্রোত। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির একটি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে প্রাণে বেঁচে যায় প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেদিন সকালে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র চারটি সতর্কবার্তা পান। এর মধ্যে একটি ছিল, উজানের বেত্রাবতী জনপদে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে এবং সেখানকার সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। খবর পাওয়ার পর শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজেন্দ্র। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী প্রায় এক হাজার ৬০০ জন। তবে ওই সময় স্কুলে থাকা প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। রাজেন্দ্র দাওয়াদি বলেন, ‘আমি আর এক মুহূর্তও দেরি না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। বন্যা না এলেও সমস্যা নেই, শুধু একদিনের ক্লাসই নষ্ট হবে।’ এরপর শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি স্কুলের পেছনের উঁচু এলাকার দিকে ছুটতে থাকেন। সেখান থেকে তিনি দেখতে পান, নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে থাকা একটি আবাসিক ভবন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিবিসিকে রাজেন্দ্র বলেন, ‘আমরা যদি আর ১০ মিনিট দেরি করতাম সিদ্ধান্ত নিতে, তাহলে আজ আমি বা আমার শিক্ষার্থীরা কেউই আপনাদের সামনে কথা বলার জন্য বেঁচে থাকতাম না।’ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইউনিশা জানান, প্রধান শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তিনি স্কুলের পেছনের সরু ও কাদাময় পথ ধরে উঁচু জায়গার দিকে দৌড়াচ্ছিলেন। পেছনে ফিরে তিনি দেখতে পান, বন্যার পানিতে ত্রিশূলী বাজার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। ইউনিশার ভাষায়, ‘চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যেই বাজারটি ভেসে গেল।’ বন্যার খবর পাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন ইউনিশার মা সাবিনা। তিনি জানান, মেয়েকে ও তাঁর বাবাকে বারবার ফোন করেও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। পরে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হলে কিছুটা স্বস্তি পান তিনি। তবে ইউনিশা বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তাঁর দুশ্চিন্তা কাটেনি। বন্যার তিন দিন পর বাড়িতে ফেরেন ইউনিশা। মেয়েকে ফিরে পেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন সাবিনা। সেই কান্না ছিল স্বজনকে হারানোর নয়, বরং ফিরে পাওয়ার আনন্দের। শিক্ষার্থী ইউনিশা (মাঝে) ও তার মা-বাবা। ছবি: বিবিসি তবে নেপালের এই দুর্যোগে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন সৌভাগ্য পায়নি। কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আটকে পড়া প্রায় ৪০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে নেপালি সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে উদ্ধার করে বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি জানান, বন্যার পানি এখন স্কুলের মাঠের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে সেখানে আবার ক্লাস শুরু করার মতো পরিস্থিতি নেই। বন্যা ও ভূমিধসে নুয়াকোট, রাসুয়া ও ধাদিং জেলার অন্তত ২০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর কাছাকাছি থাকা ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলোর বেশির ভাগ শ্রেণিকক্ষ কাদা, বালি ও পলিমাটিতে ভরে গেছে। নুয়াকোটের ত্রিভুবন মাল্টিপল ক্যাম্পাস এবং ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেলও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কমিউনিটি ও বেসরকারি—দুই ধরনের স্কুলই রয়েছে। এদিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রোববার পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সর্বশেষ হিসাবে দেশটিতে ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির হিসাবে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। তবে কোন দেশের কতজন নিখোঁজ, সেই তালিকা নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এখনো হালনাগাদ করেনি। চীনা কর্মকর্তাদের হিসাবে, তিব্বতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপাল থেকে নেমে আসা নদী থেকে ভারতের সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলো বন্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মরদেহ বলে ধারণা করা হলেও এখনো নেপাল ও তিব্বতের মোট মৃতের হিসাবে এগুলো যুক্ত করা হয়নি। নেপালে নিখোঁজ নেপালি নাগরিকের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। রোববারের হিসাবে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তালিকায় ১ হাজার ৯১০ জন নেপালি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলায় নিখোঁজ ৫৬২ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন, নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৫ সদস্য, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৩৮ সদস্য এবং শুল্ক ও অভিবাসন বিভাগের ১৯ কর্মকর্তা রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে ১০৪ জন নেপালি নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে ২৭৫ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরও ১২৮ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, চীনের অংশে প্রায় ৯০০ ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছেন। তাঁরা নিরাপদে আছেন এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। তবে তিব্বতে ৪৯ জন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রায় ৮৫ জন মার্কিন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। কোনো মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বন্যা ও ভূমিধসে বিধ্বস্ত নেপালের নুয়াকোট। ছবি: এএফপি এ ছাড়া নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে নেপালে ৬১ জন ইউক্রেনীয়, ৫১ জন মালয়েশীয় ও ৪২ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের ৩৩, লাটভিয়ার ২৯, কানাডার ২৫, দক্ষিণ কোরিয়ার ৯, সিঙ্গাপুরের ৯, জার্মানির ৮ এবং রাশিয়ার ৯ নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। রাশিয়ার দুজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি সংস্থা, নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড এবং চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দেওয়া তথ্যে নিখোঁজের সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একই ব্যক্তির বিষয়ে বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন তথ্য থাকায় সামগ্রিক হিসাবেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে এএফপি। বড় ধরনের এই দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজ এখনো চলছে। ফলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে ভয়াবহ বন্যার মধ্যেও ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীর বেঁচে যাওয়ার ঘটনাটি দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্যোগের মুহূর্তে সময়মতো একটি সঠিক সিদ্ধান্ত কত মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।