প্রকাশ :: ... | ... | ...

‘ককরোচরা’ কবে রাজনীতিতে নামছে


সংযুক্ত ছবি

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ককরোচ জনতা পার্টি—সিজেপির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তরুণদের আন্দোলন বড় ধরনের রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে। তবে এই সাফল্যকে চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে দেখছেন না আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তার বক্তব্য, মাত্র ৩৭ দিনের আন্দোলনে একটি বড় দাবি আদায় হলেও সামনে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। রোববার সকালে সিজেপির এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘এটা কেবল শুরু। ককরোচ জনতা পার্টিকে অনেক দূর যেতে হবে।’ তবে আন্দোলনের এই সাফল্যের পরপরই সরাসরি পূর্ণকালীন রাজনীতিতে প্রবেশের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। বরং তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তরুণ প্রজন্মের দাবি পূরণের জন্য চাপ সৃষ্টি করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সিজেপির মুখপাত্ররা। ৩৭ দিনের আন্দোলনের পর স্বস্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন টানা ৩৭ দিন ধরে চলার পর ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন মোড় নেয়। আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। অবশেষে আন্দোলনের চাপের মুখে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। পরে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা ও অভিযোগ প্রত্যাহারের আশ্বাসসহ অন্যান্য দাবিও মেনে নেওয়া হলে সিজেপি আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। রোববারের ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে বলেন, কয়েক সপ্তাহের টানা আন্দোলনের পর তিনি অবশেষে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। নিজের ঘরে ফিরে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দীপকের ভাষায়, ‘আমি ঘুমাতে যেতে পেরেছি এবং নিজের শোবার ঘরে ঘুম থেকে উঠতে পেরেছি—এরপর কী করতে হবে বা সন্ধ্যা পর্যন্ত কী ঘটবে, তা নিয়ে না ভেবেই।’ তবে তিনি ৩৭ দিনের আন্দোলনের সময়টিকে অত্যন্ত কঠিন বলে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে সরকার আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পর আপাতত তার উদ্বেগ অনেকটাই কমেছে বলেও জানান। ব্যঙ্গ থেকে আন্দোলনের নেতৃত্বে ককরোচ জনতা পার্টির যাত্রা শুরু হয়েছিল মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে অভিজিৎ দীপকে নিজেকে ‘ককরোচ’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। প্রথমদিকে সংগঠনটির কার্যক্রম ছিল অনেকটাই ব্যঙ্গাত্মক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেকারত্ব, সরকারি জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয় এটি। পরবর্তীতে নিটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হলে সিজেপি দ্রুত তরুণদের একটি বড় অংশের সমর্থন পেতে থাকে। দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। তরুণদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সমর্থন জানাতে শুরু করেন। রাজনীতিতে নামার প্রশ্নে এখনই সিদ্ধান্ত নয় সিজেপির এই আন্দোলন সফল হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এবার কি সংগঠনটি সরাসরি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে? সংগঠনটির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অবশ্য বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করেননি। তিনি বলেন, ভারতে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো বিষয়কেই একেবারে ‘না’ বলা ঠিক নয়। তবে আপাতত তার ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া। তিনি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তিনি বাড়ির বাইরে ছিলেন। এখন কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে গত কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে ভাবতে চান। তবে সিজেপির আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাস আরও স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, এখনই পূর্ণকালীন রাজনীতিতে প্রবেশ করা তাদের লক্ষ্য নয়। সৌরভ দাস বলেন, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করা। তার মতে, দেশে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক দল থাকলেও তরুণদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছে। সিজেপির পরিকল্পনা হলো—দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের সংগঠিত করা এবং যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের ওপর তরুণদের দাবি বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করা। https://x.com/Cockroachisback/status/2081207288975532204?ref_src=twsrc%5Etfw%7Ctwcamp%5Etweetembed%7Ctwterm%5E2081207288975532204%7Ctwgr%5E71979d78fcf0ec28a415df6260842ad85964eba7%7Ctwcon%5Es1_c10&ref_url=https%3A%2F%2Fbangla.thedailystar.net%2Finternational%2Fnews-3946416 ‘ককরোচদের’ সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ আন্দোলনের নেতৃত্বের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজপথের এই শক্তিকে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে রূপ দেওয়া যায়। একটি আন্দোলন সফলভাবে একটি মন্ত্রীর পদত্যাগ আদায় করতে পারে—এটি নিঃসন্দেহে বড় ঘটনা। কিন্তু সেই সাফল্যকে স্থায়ী পরিবর্তনে রূপ দিতে হলে সংগঠন, নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। সিজেপি এখনই রাজনৈতিক দল না হলেও তাদের সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, আন্দোলনের সময় যে বিপুল তরুণ সমর্থন তৈরি হয়েছে, সেটি কীভাবে ধরে রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মতো দীর্ঘমেয়াদি দাবিগুলো কীভাবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নেওয়া হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করেই তারা কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারবে। অভিজিৎ দীপকের ‘অনেক দূর যেতে হবে’ মন্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, সিজেপি আপাতত আন্দোলনের সমাপ্তিকে নিজেদের সংগঠনের শেষ হিসেবে দেখছে না। বরং এটিকে একটি বৃহত্তর যাত্রার সূচনা হিসেবে দেখছে। জেপি নাড্ডা, ডা. জিতেন্দ্র সিংয়ের সঙ্গে সিজেপির সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা সমালোচকদেরও ধন্যবাদ আন্দোলনের সাফল্যের পর সমর্থকদের পাশাপাশি সমালোচকদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। তার মতে, সমালোচকদের প্রশ্ন ও আপত্তি তাকে নিজের অবস্থান এবং কাজের ধরন আরও উন্নত করতে সাহায্য করেছে। এমনকি আন্দোলনের সাফল্যের পেছনেও সমালোচনার একটি ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এদিকে অসুস্থতার কারণে আন্দোলন প্রত্যাহারের পর যন্তর মন্তরে উপস্থিত সবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন দীপকে। তিনি ৩৭ দিন ধরে আন্দোলনের পাশে থাকা প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, দেশের জন্য তারা যে ভূমিকা রেখেছেন, তা তিনি কখনো ভুলবেন না। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের রাজনৈতিক তাৎপর্য ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে ভারতের রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এটি ছিল মূলত তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনের চাপের ফল। কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের সরাসরি নেতৃত্ব ছাড়াই একটি আন্দোলন এতটা শক্তিশালী হয়ে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করেছে—এটি ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন ধরনের রাজনৈতিক সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু অনলাইন আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রাজপথের আন্দোলনেও নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। সিজেপির উত্থান সেই পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে আন্দোলনের সাফল্যের পর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সংগঠনটির অবস্থান এখনো সতর্ক। তারা সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে না গিয়ে আপাতত তরুণদের মধ্যে সংগঠন গড়ে তোলা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনার পথেই এগোতে চাইছে। ### কমেন্ট সিজেপির আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু একজন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয়; বরং এর মাধ্যমে ভারতের তরুণ সমাজের রাজনৈতিক শক্তি ও প্রভাবের একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ কীভাবে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। তবে এখানেই সিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও শুরু হচ্ছে। রাজপথে আন্দোলন করে দাবি আদায় করা এক বিষয়, আর দীর্ঘমেয়াদে একটি সংগঠনকে কার্যকর রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এখন তাদের সামনে প্রমাণ করার পালা—তারা কি শুধু একটি সফল আন্দোলনের স্মৃতি হয়ে থাকবে, নাকি তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিকে কেন্দ্র করে একটি স্থায়ী সামাজিক শক্তিতে পরিণত হবে। অভিজিৎ দীপকের ‘এটা কেবল শুরু’ এবং ‘অনেক দূর যেতে হবে’—এই বক্তব্য তাই ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবাহী। সিজেপি এখনই নির্বাচনী রাজনীতিতে না এলেও, তাদের আন্দোলন যদি তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হয় এবং তরুণদের মধ্যে সংগঠিত শক্তি তৈরি করতে পারে, তাহলে ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আন্দোলনের পর ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণ প্রজন্মের প্রশ্ন, ক্ষোভ ও প্রত্যাশাকে আরও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, ‘ককরোচ’ নামে ব্যঙ্গ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে—সংগঠিত তরুণদের কণ্ঠস্বরকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা সহজ নয়।