প্রকাশ :: ... | ... | ...

কুর্দিদের অস্ত্র দিয়ে ইরানে প্রবেশ করিয়ে যুদ্ধ করাতে চায় সিআইএ; এই কুর্দিরা কারা?


সংযুক্ত ছবি

গত মাসে ইরাকের এরবিলের উপকণ্ঠে একটি ঘাঁটিতে কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির (পিএকে) ইরানি কুর্দি যোদ্ধারা একটি প্রশিক্ষণ অধিবেশনে অংশ নিচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

ইরাকভিত্তিক ইরানি কুর্দি বাহিনী সশস্ত্র ইউনিট প্রস্তুত করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে তারা ইরানে প্রবেশ করতে পারে এবং ইরান সরকারের বিরুদ্ধে নতুন এক ফ্রন্ট খুলতে পারে। এর মধ্যেই সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান উসকে দিতে কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দেওয়ার কাজ করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরাকে থাকা ইরানি বিরোধী গোষ্ঠী এবং কুর্দি নেতাদের সঙ্গে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সক্রিয় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে থেকেই সিআইএ ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে এই সহায়তা দেওয়া শুরু করে বলে জানা গেছে। হোয়াইট হাউস অবশ্য অস্বীকার করেছে যে তারা ইরানে কুর্দিদের বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানে সম্মতি দিয়েছে। তবে এই অঞ্চলে কুর্দি মিলিশিয়াদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আবার তাদের ছেড়ে যাওয়ারও বদনাম আছে আমেরিকার। ১৯৯১ সালের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে কুর্দিদের বিদ্রোহ করতে উৎসাহিত করেছিল। কিন্তু পরে ইরাকি সেনাবাহিনী যখন কুর্দিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়, তখন যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে ছিল। কুর্দিরা একটি জাতিগোষ্ঠী, যাদের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। মূলত ইরান, ইরাক, সিরিয়া এবং তুরস্ক এই চারটি দেশজুড়ে তারা ছড়িয়ে আছে। দীর্ঘকাল ধরে তারা নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বা অন্তত স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী যাদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সময় বিশ্বশক্তিগুলো কুর্দিদের নিজস্ব রাষ্ট্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক কুর্দি এজন্য ১৯১৬ সালের সাইকস-পিকো চুক্তিকে দায়ী করে। এটি ছিল ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে এক গোপন চুক্তি, যার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে ভাগ করা হয়েছিল। এই চুক্তির কারণেই কুর্দিরা তাদের রাষ্ট্র থেকে বঞ্চিত হয় এবং এমন সব দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যারা প্রায়ই তাদের প্রতি শত্রুতা দেখিয়েছে। এরপর থেকে কুর্দিরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছে। নিজেদের ভাষায় কথা বলা, সংস্কৃতি পালন করা, এমনকি নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এই বঞ্চনা থেকেই কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো হয়। কিছু দেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। যেমন কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকে। তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কিছু দেশ পিকেকে-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী কুর্দি ইরানি তরুণী মাহসা আমিনি নীতি পুলিশের হেফাজতে মারা যান ইরানে কুর্দিরা কতটা শক্তিশালী? ইরানের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ কুর্দি। তারা মূলত দেশটির উত্তর-পশ্চিমে ইরাক সীমান্তের কাছে বসবাস করে। ইরানের ধর্মতাত্ত্বিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামে তারা সব সময়ই সামনের সারিতে ছিল। ২০২২ সালে ২২ বছর বয়সী কুর্দি ইরানি তরুণী মাহসা আমিনি নীতি পুলিশের হেফাজতে মারা যান। হিজাব ঠিকমতো না পরার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে শুরু হলেও এতে কুর্দি সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভও মিশে ছিল। ওই সময় কুর্দি বিক্ষোভকারীরা ইরানের কুর্দি অধ্যুষিত ওশনাভিয়ে শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। যদিও পরে সরকারি বাহিনী তা পুনর্দখল করে। ইরাকভিত্তিক ইরানি প্যারামিলিটারি গ্রুপ 'কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি'র মুখপাত্র হানা ইয়াজদানপানা তখন বলেছিলেন, 'এটা শুধু হিজাবের বিষয় নয়, কুর্দিরা স্বাধীনতা চায়।' কিছু ইরানি কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরাকি কুর্দিস্তানে ঘাঁটি গেড়েছে। ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের এই এলাকাটি বাগদাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকে একে আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কুর্দিরা কি ইরানে যুদ্ধে জড়াবে? কুর্দি মিলিশিয়ারা অতীতে একে অপরকে সাহায্য করতে সীমান্ত পেরিয়েছে। বিশেষ করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তুরস্ক, ইরাক ও ইরানের কুর্দিরা সিরিয়ার সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। তবে ইরানের কুর্দি অঞ্চলে সশস্ত্র অভ্যুত্থান হলে এই অঞ্চলের অন্য কুর্দিরা কতটা সাড়া দেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল কুর্দি বাহিনী। তারা আইএসের বিরুদ্ধে লড়েছে, মার্কিন ঘাঁটি পাহারা দিয়েছে এবং হাজার হাজার আইএস যোদ্ধা ও তাদের আত্মীয়দের বন্দিশিবির ও কারাগার পরিচালনা করেছে। তবে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেওয়ায় সেই মৈত্রীতে এখন ফাটল ধরেছে।