প্রকাশ :: ... | ... | ...

ক্যান্সারের ইনজেকশনে পানি, সরকারি স্কিমের ওষুধ কালোবাজারে: ভারতে চক্রের সন্ধান


সংযুক্ত ছবি

ক্যানসারের দামি ওষুধের আসল উপাদান ফেলে পানি ভর্তি করে তা কালোবাজারে বিক্রির এক বড় প্রতারক চক্রের সন্ধান পেয়েছে ভারতের দিল্লি পুলিশ। ক্যান্সারের দামি ইনজেকশনের ভায়াল থেকে আসল ওষুধ বের করে সেখানে সাধারণ পানি ভরে বিক্রি করছিল একটি প্রতারক চক্র। ভারতে সক্রিয় তেমনই এক আন্তঃরাজ্য চক্রের সন্ধান পেয়েছে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। আর এই ভেজাল ইনজেকশনের একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের কিছু ভায়াল রাজস্থান সরকারের একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায় একাধিক সরকারি হাসপাতালেও সরবরাহ করা হয়েছিল। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং খিমসার পুরো বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। রাজস্থান মেডিক্যাল সার্ভিসেস কর্পোরেশন লিমিটেডের (আরএমএসসিএল) মাধ্যমে এসব ইনজেকশন রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া ভেজাল ইনজেকশনের চারটি ভায়াল বিকানেরের একটি সরকারি হাসপাতালেও সরবরাহ করা হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। দিল্লি পুলিশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চক্রটি প্রথমে সরকারি সরবরাহ লাইন বা হাসপাতাল থেকে ক্যান্সারের আসল ইনজেকশনের ভায়াল চুরি করত। এরপর সতর্কতার সঙ্গে ভেতরের মূল্যবান ওষুধ বের করে সাধারণ পানি বা অন্য কোনো তরল দিয়ে আবার মুখ আটকে দিত। পরবর্তীতে এসব ইনজেকশন কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হত। এই ওষুধগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাভেলুম্যাব’ নামের একটি অত্যন্ত দামি ক্যান্সারের ওষুধ। দিল্লির কালোবাজারে প্রায় এক লাখ রূপি করে এই ওষুধ কিনছিলেন রোগীরা। ভিতরে ছিল কেবলই পানি। গত ২০ অগাস্ট সাতটি রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৯ কোটি রূপির এই প্রতারক চক্রের পর্দাফাঁস করেছে দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। তারা জব্দ করা ইনজেকশন পরীক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির মাধ্যমে জার্মানির ‘মের্ক’ ল্যাবরেটরিতে পাঠায়। সেখানে পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই ভায়ালগুলোতে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় কার্যকর উপাদানের কোনও অস্তিত্বই নেই। মূলত সরকারি স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে রোগীদের এই ওষুধ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা পাচার হয়ে যাওয়ার কারণে ভুক্তভোগী রোগীরা কালোবাজার থেকে বিপুল অর্থ খরচ করে ভায়ালগুলো কিনতে বাধ্য হন। এতে অর্থ হারানোর পাশাপাশি সাধারণ পানি শরীরে প্রয়োগের ফলে তাদের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়েছিল। পুলিশের দাবি, এই চক্রের নেটওয়ার্ক দিল্লি-এনসিআর ছাড়িয়ে মুম্বাই, হায়দরাবাদ, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল। ২২ জুন গোপন সূত্রে খবর পাওয়ার পর শুরু হয় তদন্ত। পূর্ব দিল্লি, রোহিণী এবং মুম্বাইয়ে কয়েকটি সন্দেহজনক জায়গা চিহ্নিত করা হয়। গত ১১ জুলাই মাদক বিরোধী দপ্তর ও স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে সাতটি দল দিল্লি এবং নবি মুম্বইয়ে একসঙ্গে তল্লাশি চালায়। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ এবং তল্লাশির ভিত্তিতে ১৭ জনকে গ্রেপ্ফতার করা হয়। পুলিশ জানায়, মূলত তিনটি পথে এই চক্রের হাতে ওষুধ পৌঁছত। প্রথমত, নকল ওষুধ কেনা হত। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে ক্যানসার রোগীদের জন্য মজুত রাখা ওষুধ সরিয়ে ফেলা হত। তৃতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুদাম থেকে ওষুধ বাইরে পাচার করা হত। এরপর এই ওষুধগুলো বৈধ বিল, কেনার রেকর্ড, ড্রাগ লাইসেন্স এবং প্রয়োজনীয় নথি ছাড়াই বিভিন্ন বাড়ি ও অন্য জায়গায় মজুত করা হত। পরে তা দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হত। বিষয়টি নজরে আসার পর রাজস্থানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পুরো সাপ্লাই চেইন, স্টক রেজিস্টার, ইনডেন্ট, ডিসপ্যাচ রেকর্ড এবং হাসপাতাল পর্যায়ে সরবরাহের সমস্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য নির্ধারিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধের বেআইনি বিক্রি বা কালোবাজারি কোনওভাবেই বরদাশত করা হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থার কোনও ধাপে কারও গাফিলতি, অনিয়ম বা যোগসাজশ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইসঙ্গে সরকারি ওষুধ সরবরাহ ও বণ্টন ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ওদিকে, রাজস্থান সরকারের স্কিমের ওষুধ কীভাবে কালোবাজারে পৌঁছাল, পাচারের সঙ্গে কারা জড়িত এবং অন্য কোনো জীবনরক্ষাকারী ওষুধে একইভাবে ভেজাল মেশানো হয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে দিল্লি পুলিশ।