প্রকাশ :: ... | ... | ...

ডেমোক্র্যাটরা জিতলে কংগ্রেস ছাড়াই দেশ চালানোর ছক ট্রাম্প প্রশাসনের


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে কীভাবে নিজেদের নীতি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখা যায়, তার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। অভিবাসন, আমদানি শুল্ক, আবাসন ব্যয় ও সরকারি অর্থের ব্যবহার নিয়ে কংগ্রেসের নতুন আইন ছাড়াই নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সম্ভাব্য পথ খতিয়ে দেখছেন হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য তদন্ত ও তথ্য তলব মোকাবিলার প্রস্তুতিও চলছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা এবং পরিকল্পনার বিষয়ে অবগত আরও দুই ব্যক্তির বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা বলেছেন, গত এপ্রিল থেকে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার, বাজেট পরিচালক রাসেল ভটসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা আইন উপদেষ্টার কার্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছেন। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে তাঁরা আইনি পর্যালোচনা করছেন। হোয়াইট হাউসের আইন উপদেষ্টা উইল শার্ফ ও তাঁর দল প্রেসিডেন্টের আইনগত ক্ষমতার পরিধি, সেই ক্ষমতার সীমা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত করা যায় এবং আদালতে নির্বাহী সিদ্ধান্তের পক্ষে কীভাবে যুক্তি উপস্থাপন করা সম্ভব—এসব বিষয় পর্যালোচনা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবেন। তবে প্রেসিডেন্টের হাতে নির্বাহী আদেশ, বাণিজ্যনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতা থাকবে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই আগাম পরিকল্পনা করছে হোয়াইট হাউস। যেসব খাতে নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনায় থাকা পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উইন্ড টারবাইন আমদানিতে নতুন শুল্ক আরোপ, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ভিসার নিয়ম কঠোর করা এবং আবাসন ও নির্মাণ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে প্রশাসন জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য কোন আইনি ভিত্তি ব্যবহার করা হবে, তা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়নি। নির্বাহী ক্ষমতায় শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অভিবাসন নীতিতেও নতুন বিধিনিষেধের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন কতটা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এগোতে পারবে, আর কোন পদক্ষেপের জন্য বিদ্যমান আইন বা কংগ্রেসের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে, তা আইনি পর্যালোচনার অংশ। আবাসন ও নির্মাণ ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে প্রশাসনিক নির্দেশ জারির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর বিস্তারিত, সম্ভাব্য ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি। কংগ্রেসের বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারে নতুন কৌশল সরকারি ব্যয় নিয়ে রাসেল ভটের নেতৃত্বে আলাদা পর্যালোচনা চলছে। কংগ্রেস ইতিমধ্যে যেসব খাতে অর্থ বরাদ্দ করেছে, সেই অর্থের মধ্যে থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন বাজেট কর্মকর্তারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কংগ্রেসের নতুন অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া যেতে পারে—এমন পদক্ষেপের প্রস্তাব ও আইনি পর্যালোচনা জমা দিয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, বিদ্যমান বরাদ্দের আওতায় কোন কোন কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, তা চিহ্নিত করা। সরকারি অনুদান দেওয়ার নিয়মেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সরকারি অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তে আরও বেশি ভূমিকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের পরিবর্তন সরকারি অর্থ ব্যবহারে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে। তবে প্রশাসনের যুক্তি ও প্রস্তাবিত নিয়মের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ না হওয়ায় এর প্রকৃত প্রভাব এখনই নির্ধারণ করা কঠিন। কংগ্রেসের বরাদ্দ করা অর্থ নির্বাহী বিভাগ কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে, তার আইনি সীমা রয়েছে। কোনো অর্থ কোন উদ্দেশ্যে ব্যয় করা যাবে, তা আইন ও বরাদ্দের শর্তে নির্ধারিত থাকতে পারে। ফলে প্রশাসনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে শুধু নির্বাহী নির্দেশই যথেষ্ট হবে না; সংশ্লিষ্ট আইন ও বরাদ্দের শর্তও মানতে হবে। ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখে পড়তে পারে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর সম্ভাবনার পাশাপাশি প্রশাসনের কর্মকর্তারা ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত নিয়েও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট নেতা ও কমিটির কর্মকর্তারা ট্রাম্প নিজের, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা অনুদানদাতাদের সুবিধার্থে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুনানি, সমন ও নথি তলবের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসের আইনজীবীরা সম্ভাব্য তদন্তের বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের প্রস্তুত করছেন। কংগ্রেসের তথ্য চাওয়া, নথি তলব এবং সমনের জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত উপদেষ্টাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের যোগাযোগসংক্রান্ত নথি কংগ্রেসের তদন্ত থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নির্বাহী বিশেষাধিকারের যুক্তি প্রয়োগ করা যায় কি না, সে বিষয়েও বিচার বিভাগের মতামত চাওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে নির্বাহী বিশেষাধিকার সব ধরনের নথি বা তথ্য তলব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি দেয় না; এর প্রয়োগ নিয়ে আইনি বিরোধ তৈরি হতে পারে। কংগ্রেসের তদন্ত মোকাবিলায় প্রশাসনের প্রস্তুতি তাই শুধু রাজনৈতিক নয়, আইনি কৌশলেরও অংশ। ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলে তদন্তের ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন, যদিও তদন্তের ফলাফল বা প্রশাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের লড়াই ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখাই রিপাবলিকানদের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন রয়েছে। সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ককাস করা স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিরোধী পক্ষের আসন ৪৭টি। প্রকাশিত আসনবিন্যাস অনুযায়ী, দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাল্টে দিতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে। জনমত জরিপে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা গেলেও সিনেটের লড়াই তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত এক মাসে ট্রাম্প দেশজুড়ে নির্বাচনী সমাবেশ করে রিপাবলিকানদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন। প্রকাশ্যে হোয়াইট হাউস রিপাবলিকানদের আসন হারানোর আশঙ্কা নাকচ করেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র লরেন বিস বলেছেন, প্রশাসন সীমান্ত সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মজীবী মার্কিন নাগরিকদের হাতে আরও অর্থ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাবে। তবে নির্বাচনের ফল যাই হোক, প্রশাসনের ভেতরে ২০২৭ সালে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি চলছে। ট্রাম্পের সহযোগীরা মনে করছেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে কিছু নীতি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। নির্বাহী ক্ষমতারও সীমা রয়েছে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তারা নতুন আইন প্রণয়নে সহযোগিতা না করার পাশাপাশি প্রশাসনের মনোনীত কর্মকর্তাদের নিয়োগ আটকে দিতে এবং তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারবেন। অন্যদিকে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের প্রস্তাবিত আইন ভেটো দিতে পারেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের সব সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারবেন, এমন নয়। আবার নির্বাহী আদেশ জারি করলেই তা আইনগতভাবে বৈধ হয়ে যায় না। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করলে আদালত সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ স্থগিত বা বাতিল করতে পারেন। তাই ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে বিদ্যমান আইনের ব্যাখ্যা, কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। সব মিলিয়ে, মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার লড়াই শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি, সরকারি অর্থ ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রেসিডেন্টের জবাবদিহি—এসব বিষয়ও সামনে চলে এসেছে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ট্রাম্প প্রশাসন কতটা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে, তা নির্ধারিত হবে আইন, রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও আদালতের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে।