প্রকাশ :: ... | ... | ...

নির্বাচনে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বিশ্বকে নতুন সংকটে ফেলতে পারেন


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সব সময়ই বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে সাম্প্রতিক স্মৃতিতে এবারই প্রথম দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে এতটা আন্তর্জাতিক আগ্রহ দেখা গেছে। এর প্রধান কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। দুই বছরেরও কম সময় আগে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে তার কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকেই অস্থির করেনি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ব্যবস্থাকেও ভেঙে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক দুর্ভোগ। তাই মঙ্গলবারের নির্বাচনে ট্রাম্পের বড় পরাজয়ে দেশে-বিদেশে তার সমালোচকদের স্বস্তি ও সন্তুষ্টি প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। নির্বাচনি জরিপে ধারণা করা হয়েছিল, রিপাবলিকান পার্টি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাবে। তবে ডেমোক্র্যাটরাও তাদের এত বড় ও বিস্তৃত সাফল্যের আশা করেনি। সব ভোট গণনা শেষে জনপ্রিয় ভোটে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে রিপাবলিকানদের পরাজয় ১৯৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেস নির্বাচনে দলটির সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হতে যাচ্ছে। ওই নির্বাচন হয়েছিল প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পরপরই। ডেমোক্র্যাটদের কিছু সাফল্য সত্যিই বিস্ময়কর। প্রায় ১০০ বছর পর কানসাসে সিনেট আসন জিতেছে দলটি। সর্বশেষ ১৯৩২ সালে রাজ্যটি থেকে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। আর দলটির আরেক প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হয়েছেন। নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের জন্য অপমানজনক বিপর্যয় এবং ট্রাম্পবাদ প্রত্যাখ্যানের স্পষ্ট বার্তা। প্রচারণার সময় বারবার ভোটারদের কাছে নিজেকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি নির্বাচনকে নিজের ওপর গণভোটে পরিণত করেছিলেন। ভোটাররা কার্যত সেটিই করেছেন। রিপাবলিকান প্রার্থীরা ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও তাতে কাজ হয়নি। এমনকি মেইনের অভিজ্ঞ রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সও রক্ষা পাননি। ডেমোক্র্যাটরা ৩০ বছর ধরে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এবার অবশ্য দলটির প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন তাকে হারিয়েছেন। জ্যাকসন সাবেক অঙ্গরাজ্য আইনপ্রণেতা। কয়েক মাস আগে ডেমোক্র্যাটদের পছন্দের প্রার্থী কেলেঙ্কারির কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর পর তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। এত কিছুর পরও জয় পেয়েছেন তিনি। তবে অনুতপ্ত হওয়ার বদলে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ব্যালটে তার নাম না থাকায় রিপাবলিকানরা হেরেছে। টেক্সাসে ক্ষমতার পালাবদল ট্রাম্পের সবচেয়ে অপমানজনক পরাজয়গুলোর একটি এসেছে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে। প্রায় চার দশক পর সেখানে সিনেট আসন ও গভর্নর পদ—দুটিই জিতেছে ডেমোক্র্যাটরা। সিনেট আসনে স্থানীয় রিপাবলিকান নেতাদের আপত্তি উপেক্ষা করে ট্রাম্প কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে প্রার্থী হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত প্যাক্সটন পরাজিত হয়েছেন। একই সঙ্গে হেরেছেন বর্তমান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও। হিস্পানিক প্রার্থী জিনা হিনোজোসার কাছে পরাজিত হয়েছেন তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান গভর্নর অ্যাবট। ক্যালিফোর্নিয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস টেক্সাসে। তাদের মধ্যে অ্যাবট ছিলেন অজনপ্রিয়। চলতি বছরের শুরুতে তিনি নতুন এইচ-১বি ভিসার আবেদন স্থগিত করেছিলেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ভারতীয়দের ওপর। ফলে টেক্সাসে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ভারতীয় ভোটারদেরও আংশিক ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধরন অনুকরণ করার চেষ্টা করা প্রার্থীরাও হেরেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ওহাইওর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামী। ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে রামাস্বামী তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যামি অ্যাক্টনের বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা মাকে নিয়ে একটি আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন প্রচার করেন। ওই বিজ্ঞাপনে অ্যাক্টনের মা অভিযোগ করেন, মেয়ে তার বেড়ে ওঠার বিষয়ে মিথ্যা বলেছেন এবং ভোটারদের তাকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে বিজ্ঞাপনটি দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। কয়েক দশক আগে অ্যাক্টনের শৈশবে তার সৎবাবার বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর তার মা সন্তানদের হেফাজত হারিয়েছিলেন। এ ঘটনা সামনে আসার পর রামাস্বামীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর আগে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পরে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়ে সেই দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। বিভাজনের রাজনীতিতে ট্রাম্প ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান ভোটের বাইরেও সমর্থন বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন ট্রাম্প। হিস্পানিক, কৃষ্ণাঙ্গ ও ভারতীয় ভোটারদের একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকেছিল। ভারতীয়-আমেরিকানদের প্রায় ৩০ শতাংশ তাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে সর্বশেষ নির্বাচনের ফল বলছে, এসব জনগোষ্ঠীর বড় অংশ এবার রিপাবলিকানদের ছেড়ে ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরেছে। একই প্রবণতা দেখা গেছে ঐতিহ্যগত রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যেও। নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবার প্রায় ৩০ শতাংশ হিস্পানিক এবং ১৭ শতাংশ এশীয় ভোটার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন। এশীয়-আমেরিকানদের মধ্যে চীনাদের পর ভারতীয়রা দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী। ট্রাম্পের অভিবাসন ও ভিসানীতি, তার মাগা সমর্থকদের ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ এবং ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক অনেক ভারতীয়-আমেরিকানকে হতাশ করেছে। ফলে তারা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ফিরেছেন, যে দলকে তারা ঐতিহ্যগতভাবে সমর্থন করে আসছেন। আধুনিক ইতিহাসে ট্রাম্পের মতো যুক্তরাষ্ট্রকে এতটা বিভক্ত আর কোনো প্রেসিডেন্ট করেননি। দেশটির সমাজে বর্ণ, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আগে থেকেই ছিল। তবে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে এসব বিভাজন আরও বাড়িয়েছেন এবং কাজে লাগিয়েছেন। সমালোচক, এমনকি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও অশালীন ভাষা ব্যবহার করে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ আগে দেখা যায়নি। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতিতে যখন সাধারণ মানুষ চাপে পড়েছেন, তখন তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহল বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সমালোচনায় কর্ণপাত করেননি তিনি। বিদেশিদের কাছ থেকে দামি উপহার গ্রহণও অব্যাহত রেখেছেন। এসব ঘটনায় ক্ষুব্ধ ভোটারদের অভিযোগ, রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করেছেন এবং তার কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্যর্থ হয়েছেন। ইরান যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সাধারণত পররাষ্ট্রনীতি বড় ইস্যু হয়ে ওঠে না। তবে ট্রাম্পের কারণে এবার ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণেই রিপাবলিকানরা নির্বাচনে হেরেছে। শুরু থেকেই এ যুদ্ধের বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেছিলেন তিনি। ট্রাম্পের সমর্থকদের একাংশের কাছেও যুদ্ধটি ছিল অত্যন্ত অজনপ্রিয়। ধারণা করা হচ্ছে, সংঘাতটিতে এ পর্যন্ত ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের জন্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল আরও সরাসরি। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। ডিজেলের দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশ, যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে গ্রামীণ এলাকার রিপাবলিকান ভোটারদের ওপর। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা এমনিতেই হারতে পারত, তবে যুদ্ধ তাদের পরাজয় আরও বড় করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরান যুদ্ধ এমন একটি দেশে ইসরাইলের জনপ্রিয়তাও কমিয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদি লবির প্রভাব শক্তিশালী। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাইয়েদের জয়ও সেই প্রভাবের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসরাইলের কড়া সমালোচক এল-সাইয়েদ প্রথমে দলের প্রাথমিক নির্বাচনে এবং পরে মঙ্গলবারের মূল নির্বাচনে জয় পান। ইসরাইলপন্থি লবি সংগঠন আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) তার বিরুদ্ধে প্রচারণায় ৩২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এল-সাইয়েদকে জিহাদি ও সন্ত্রাসবাদে সহানুভূতিশীল হিসেবে আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের প্রচারণাও ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের ফল কি বদলাবে ট্রাম্পকে? যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের জন্য সামনে পথ সহজ হবে না। এতদিন তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এখন তা আগের মতো সহজ হবে না। বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস ইরান যুদ্ধের অর্থায়ন আটকে দিতে পারে কিংবা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ফিরিয়ে নিতে পারে। ট্রাম্প এসব উদ্যোগে ভেটো দিতে পারবেন। তবে তার ভেটো বাতিল করতে ডেমোক্র্যাটদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন, যা তাদের নেই। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় এতদিন ট্রাম্প প্রায় বাধাহীনভাবে কাজ করতে পেরেছেন। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তবে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে থাকা প্রেসিডেন্টের হাতেও এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষমতা থাকে। কর্তৃত্ববাদী কায়দায় ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই এতে দেশটির মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বরং নির্বাচনে পরাজয়ের ক্ষোভ দেশের বাইরে সামরিক হস্তক্ষেপ বাড়ানোর মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন ট্রাম্প। তিনি নিজেকে পরাজিত হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন না; তাই কোনো না কোনো বিজয় অর্জনের চেষ্টা করবেন। প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেটের অধিকারী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক তিনি। এ কারণেই তাকে আরও বিপজ্জনক মনে করা হচ্ছে। শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে কিউবায় হামলার উদ্যোগও নিতে পারেন ট্রাম্প। দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা গোপন করেননি মার্কো রুবিও। তবে কিউবার চেয়েও ইরান নিয়ে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর বেশি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশই ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে। গত সপ্তাহের নির্বাচনে পরাজয়ের পরও প্রধানমন্ত্রী থাকার জন্য বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আরেকটি সামরিক অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি ঘাঁটি থেকে মার্কিন সেনাসদস্যদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইরান ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে, এবার তাদের পাল্টা জবাব আরও বড় হবে। তেলনির্ভর উপসাগরীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের বহু দেশ নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতি জেডি ভ্যান্সের জন্যও সুখবর হবে না। তিনি এখনো ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার আশা করছেন। ইতিমধ্যে তিনি শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও ‘পরিবর্তন’ আনার কথা বলেছেন। কিন্তু ট্রাম্প এখন নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েই বেশি ভাববেন, সেই পথে ঝুঁকি যতই থাকুক না কেন। ইউক্রেন, রাশিয়া ও ভারত জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইউক্রেনে হামলা শুরু করেছিল রাশিয়া। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নানা সমস্যার পাশাপাশি যুদ্ধের জন্যও বাইডেনকে দায়ী করে আসা ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমিয়ে দিয়েছেন। ২০২৫ সালে হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে তার আচরণের কথা সবার জানা। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক জেলেনস্কির তুলনায় ভালো। সম্প্রতি রাশিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে মস্কোর সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তিও করেছেন। যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে নিজের বিজয় হিসেবে তুলে ধরার মতো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ইউক্রেনের ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে পারেন তিনি। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার কাছে ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার শর্ত মেনে নিতে কিয়েভকে বাধ্য করার চেষ্টা হতে পারে। রাশিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে ভারত লাভবান হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করা উচিত নয় দিল্লির। ট্রাম্প বিশ্বের অধিকাংশ দেশের ওপর শুল্ক আরোপ করলেও নীতিগতভাবে তা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি শিগগিরই স্বাক্ষরিত হতে পারে। কারণ, ট্রাম্প এ চুক্তিকে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন। তবে ভারতীয়দেরও প্রভাবিত করা কঠোর অভিবাসন ও ভিসানীতি বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, এসব নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভোটারের কাছে জনপ্রিয়। তবে ডেমোক্র্যাটরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন সংস্থা আইসিইর (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) নীতিতে নমনীয়তা আনার জন্য চাপ দেবে। সংস্থাটির কঠোর অভিযান এবং আটককেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে তদন্তের আহ্বানও জানিয়েছেন দলটির নেতারা। বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ উপদেষ্টাদের পরামর্শে পরিচালিত হচ্ছে না। বরং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রবৃত্তিই তার নীতিনির্ধারণে প্রাধান্য পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের বদলে পররাষ্ট্রনীতির আলোচনায় তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ব্যবসায়ী বন্ধু স্টিভ উইটকফকে যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে পেন্টাগনের দায়িত্বে থাকা যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথকে সামরিক বিশেষজ্ঞের বদলে ট্রাম্পের অনুগত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে আহত ট্রাম্প এখন আগের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। সূত্র: এনডিটিভি