নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৮২৬ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ পর্যটক। তাঁদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১টা পর্যন্ত পাওয়া হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২৮৯। তাঁদের মধ্যে চিতওয়ানে ১০৮, নাওয়ালপরাসি ইস্টে ৬২, ধাদিংয়ে ২৭, গোরখায় ২০, রাসুয়ায় ১৭, নাওয়ালপরাসি ওয়েস্টে ১৫, নুওয়াকোটে ১২ এবং তানাহুনে ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটির সর্বশেষ হিসাবে, নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দা, নিরাপত্তাকর্মী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নেপালি সেনাবাহিনীর ৪৪ জন, নেপাল পুলিশের ২৮ জন এবং আর্মড পুলিশ ফোর্স নেপালের ১৩ জন সদস্য রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা ৬৪৪। তাঁদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি এবং ১২৭ জন নেপালি পর্যটক। বিদেশি নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ১৭৭ জন ভারতীয়, ৬৩ জন মার্কিন, ৫৩ জন ইউক্রেনীয়, ৩৪ জন অস্ট্রেলীয় এবং ৩৩ জন ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন। বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির ধস নদীতে পড়ে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে নদী উপত্যকা দিয়ে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বসতি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনার শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। দুর্যোগের আগে ওই এলাকায় ভূকম্পন অনুভূতও হয়েছিল। তবে পরে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, সেটি স্বাভাবিক ভূমিকম্প না-ও হতে পারে। বরং ভূমিধসের সময় সৃষ্ট শক্তি থেকেই ওই ভূকম্পনসদৃশ কম্পন তৈরি হয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে। নেপালের রাসুয়া জেলার উঁচু পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ নিচের নদী উপত্যকায় পড়ে যায়। এর ফলে নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। পরে সেই স্রোত নেপালের বিভিন্ন জনপদ এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণেও হিমবাহ ধসের সম্ভাবনার পক্ষে তথ্য পাওয়া গেছে। দুর্যোগের আগে ও পরে তোলা ছবিতে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের সামনের একটি বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় নেমে আসার চিত্র দেখা গেছে। আগে সবুজে ঢাকা থাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ পরে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যায়। ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত মনে করেন, হিমবাহের সামনের অংশের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা যুক্ত হয়ে নিচে নেমে গিয়ে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়ে থাকতে পারে। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগারও স্যাটেলাইট ছবিতে বড় ধরনের হিমবাহ ধসের ইঙ্গিত পেয়েছেন। তাঁর ধারণা, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে তুষার গলার হার বেড়ে থাকতে পারে। তবে ঠিক কী কারণে হিমবাহের অংশটি ভেঙে পড়ল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীর এলাকায় হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি পর্যালোচনা করে নেপালের অংশে বরফ ও পাথরের ধসকে বন্যার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এবারের বন্যার ভয়াবহতার অন্যতম কারণ ছিল পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, পলি ও বরফের মিশে যাওয়া। সাধারণ নদীবন্যায় পানির স্রোত প্রধান ধ্বংসকারী শক্তি হলেও এ ধরনের ধ্বংসাবশেষের স্রোতে বিশাল পাথর ও মাটি উচ্চগতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট জানিয়েছে, পানি, পলি ও বড় বড় পাথরের শক্তিশালী স্রোত ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নেমে গেছে। নদীর ভাটিতে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। দুর্যোগের প্রভাব নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও পড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। বন্যার পানিতে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থলবন্দর ও আশপাশের অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে অনেকে তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। আবার অনেকে নেপালের পার্বত্য এলাকায় ট্রেকিং বা ভ্রমণের জন্য অবস্থান করছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানিয়েছেন, দেশটির অন্তত ৩৪ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নাগরিকদের মধ্যেও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে। নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দুর্গত এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে। তবে অনেক এলাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে যাওয়ায় সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই দুর্যোগের পর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে চীনের তিব্বত অংশে দুর্যোগের কোনো পূর্বাভাস বা সংকেত পাওয়া গিয়েছিল কি না এবং পাওয়া গেলে নেপালের ভাটির জনপদগুলোকে আগাম সতর্ক করা সম্ভব ছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের তিব্বত অংশে কোনো ভূমিধস প্রতিরক্ষা বাঁধ বা অন্য কোনো অবকাঠামো ধসে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে কি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবিও ছড়িয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। চীন অবশ্য আগাম সতর্কতা না দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নেপালে চীনা দূতাবাসের বক্তব্য, ২৬ আগস্ট সকালে নেপাল প্রান্তে ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পসদৃশ হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে এবং এর ফলে সৃষ্ট বিশাল কাদার স্রোতে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী উভয় অংশে হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে। চীনা দূতাবাস বলেছে, আগাম সতর্কতা না দেওয়ার কারণে নেপালে প্রাণহানি হয়েছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। তাদের মতে, এ সময়ে দোষারোপের চেয়ে সহযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগাম সতর্কতা নিয়ে প্রশ্ন পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গোবিন্দ রাজ পোখরেল বলেছেন, চীনের উন্নত স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ধরনের পূর্বাভাস বা চিত্র পাওয়া সম্ভব ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। তাঁর মতে, নেপালের দিকে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত না থাকা সত্ত্বেও এমন আকস্মিক বন্যা মানুষের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে এখনই চীনের কোনো অবহেলার কারণে এই বিপর্যয়ের মাত্রা বেড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল, ঘটনাক্রম এবং সীমান্তের দুই পাশে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিয়ে আরও তদন্ত প্রয়োজন। একইভাবে চীনের ভূখণ্ডে কোনো বাঁধ বা প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ধসে এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে—এমন দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।