প্রকাশ :: ... | ... | ...

পতনের পরও রেহাই নেই, মানবতাবিরোধী অপরাধে বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ড


সংযুক্ত ছবি

অনুপস্থিতিতেই রায় দিল দামেস্কের আদালত, মৃত্যুদণ্ড ভাই মাহের ও চাচাতো ভাই আতেফ নাগুইবেরও একসময় সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলেন তিনি। প্রায় ২৪ বছর প্রেসিডেন্টের আসনে বসে রাষ্ট্রের বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করেছেন। ২০১১ সালে শুরু হওয়া গণবিক্ষোভ রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে। লাখো মানুষের মৃত্যু, নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির অভিযোগের ভার নিয়েই শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়তে হয় বাশার আল-আসাদকে। এবার সেই বাশারকেই মৃত্যুদণ্ড দিল দামেস্কের একটি আদালত। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্টকে তার অনুপস্থিতিতেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। একই মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তার ভাই মাহের আল-আসাদ এবং সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও চাচাতো ভাই আতেফ নাগুইবকেও। মঙ্গলবারের এই রায় শুধু তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের সিদ্ধান্ত নয়; বরং আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের পর সিরিয়ায় জবাবদিহির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ক্ষমতা গেল, এবার বিচারের কাঠগড়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রযাত্রার মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন বাশার আল-আসাদ। পরিবার নিয়ে তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান। এরপর থেকে মস্কোতেই অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হয়। দেশ ছাড়ার পরও অবশ্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় কমেনি। বরং নতুন কর্তৃপক্ষ সাবেক সরকারের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। দামেস্কের অপরাধ আদালতের এই রায় সেই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি। তবে বাশার আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে রায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিদেশে অবস্থানরত একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে দেওয়া এই সাজা বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে? কী অভিযোগ বাশারের বিরুদ্ধে? আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বাশার ও তার ভাই মাহেরকে দায়ী করা হয়েছে। বিশেষ করে মাহেরের বিরুদ্ধে হত্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ, নির্যাতন ও সহিংসতায় উসকানির অভিযোগ আনা হয়। আদালত এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। অন্যদিকে, আতেফ নাগুইবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আরও নির্দিষ্ট—২০১১ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র দারা প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সময় হত্যা ও নির্যাতনে জড়িত থাকা। আদালত বলেছে, ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো নির্যাতনের সঙ্গে নাগুইব জড়িত ছিলেন। নাগুইব অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তবে আদালত বলেছে, তার বক্তব্য উপস্থাপিত প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দারা থেকে আগুন ছড়িয়েছিল পুরো দেশে ২০১১ সালের মার্চ। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা শহর। সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল সেখান থেকেই। তরুণদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত সেই আন্দোলন ছড়িয়ে যায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। শুরু হয় সশস্ত্র সংঘাত। এরপরের ১৩ বছর সিরিয়ার ইতিহাসে পরিণত হয় এক দীর্ঘ রক্তাক্ত অধ্যায়ে। ১৩ বছরে পাঁচ লাখের বেশি মৃত্যু ‘সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস’-এর হিসাবে, ২০১১ সালে শুরু হওয়া সংঘাতে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শুধু প্রাণহানিই নয়—লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন তুরস্কে, কেউ লেবানন, জর্ডান কিংবা ইউরোপে। শহরের পর শহর ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা—কিছুই সংঘাতের বাইরে থাকেনি। এই যুদ্ধের একদিকে ছিল আসাদ সরকারের বাহিনী, অন্যদিকে বিভিন্ন বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। সময়ের সঙ্গে এতে যুক্ত হয় আন্তর্জাতিক শক্তিও। ফলে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ সংকট রূপ নেয় জটিল আন্তর্জাতিক সংঘাতে। আসাদ পরিবারের পাঁচ দশকের শাসন বাশার আল-আসাদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বুঝতে হলে পেছনে ফিরতে হয় আরও কয়েক দশক। ১৯৭০ সালে ক্ষমতায় আসেন তার বাবা হাফেজ আল-আসাদ। ২০০০ সালে তার মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট হন বাশার। এরপর টানা প্রায় ২৪ বছর ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। বাবা-ছেলের শাসন মিলিয়ে আসাদ পরিবার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় সিরিয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেছে। বাশার শুরুতে তুলনামূলক আধুনিক ও সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে কিছু মানুষের প্রত্যাশা তৈরি করলেও সময়ের সঙ্গে তার শাসন ক্রমেই কঠোর হয়ে ওঠে বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করেন। ২০১১ সালের আন্দোলন সেই শাসনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনই গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। রাশিয়ায় আশ্রয়, সিরিয়ায় বিচার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাশারের জন্য রাশিয়ার দরজা খুলে যায়। বিদ্রোহীদের হাতে রাজধানী দামেস্কের পতনের পর পরিবারসহ দেশ ছাড়েন তিনি। রাশিয়া তাকে আশ্রয় দেওয়ার পর থেকে সিরিয়ার নতুন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দামেস্কে নতুন সরকার পুরোনো শাসনের কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। তবে অনুপস্থিতিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হলে বাশারকে সিরিয়ার হেফাজতে আনা প্রয়োজন। আর সেই প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিচার কি ন্যায়বিচার, নাকি প্রতিশোধ? বাশার সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত। ভুক্তভোগীদের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা তাই নতুন সিরিয়ার অন্যতম বড় দাবি। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কর্তৃপক্ষের বিচারপ্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রভাব রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর একটি রাষ্ট্র যখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে, তখন শুধু পুরোনো শাসকদের শাস্তি দিলেই বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিচারপ্রক্রিয়া। সামনে কঠিন পথ বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় সিরিয়ার ইতিহাসে একটি প্রতীকী মুহূর্ত। যে ব্যক্তি একসময় রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, আজ তার নাম উচ্চারিত হচ্ছে আসামি হিসেবে। তবে এই রায় সিরিয়ার সংকটের শেষ নয়। যুদ্ধের ক্ষত এখনো গভীর। বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাস রয়ে গেছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। তাই বাশারের বিচার যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন— সিরিয়া কি প্রতিশোধের রাজনীতি পেরিয়ে সত্যিকারের ন্যায়বিচার, শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে হাঁটতে পারবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে, বাশার আল-আসাদের পতন শুধু একজন শাসকের পতনের গল্প হয়ে থাকবে, নাকি সিরিয়ার জন্য একটি নতুন রাষ্ট্রীয় অধ্যায়ের সূচনা করবে।