পারমাণবিক সংঘাত কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষতিকর ব্যবহারের কারণে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী *দ্য ল্যানসেট*-এর নতুন বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে এমন সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষকেরা বলেছেন, এসব বিপর্যয়ের সম্ভাবনা কম হলেও পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে। ‘দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’ নামে বিশেষজ্ঞ কমিশনটি রোববার তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করে। এতে ২০২৫ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্য ও অস্তিত্বের জন্য বড় ১৭টি হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় মানবজাতির বিলুপ্তির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে—এমন দুটি ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পারমাণবিক সংঘাত এবং এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহার, যার মধ্যে এআইয়ের সহায়তায় জীবাণু অস্ত্র তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। কমিশনের বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হুমকি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে একটি ঝুঁকিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে বিবেচনা করলে সামগ্রিক বিপদ মোকাবিলা কঠিন হতে পারে। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা। কমিশনের কো-চেয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের পরিচালক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, বিশ্বনেতারা এখন যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেগুলোই আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলবে। পারমাণবিক যুদ্ধের পর দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় ধরনের পারমাণবিক সংঘাতের পর বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছানোর পরিমাণ কমে গেলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও কৃষি উৎপাদনে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। এর পরিণতিতে দেখা দিতে পারে ব্যাপক খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ। পারমাণবিক যুদ্ধের তাৎক্ষণিক প্রাণহানির পাশাপাশি এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এআইয়ের অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মূল্যায়নে, এআই ব্যবহার করে বিপজ্জনক জীবাণু বা জৈব অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়লে তা জনস্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তবে কমিশন এসব পরিস্থিতিকে অনিবার্য ভবিষ্যৎ হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং ঝুঁকিগুলোর সম্ভাব্য ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ১৭টি হুমকির তালিকায় জলবায়ু, দূষণ ও অপুষ্টি কমিশনের মূল্যায়নে পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের অপব্যবহারের পাশাপাশি আরও ১৫টি বড় হুমকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বায়ুদূষণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর বিরুদ্ধে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যাওয়া, শিশুদের অপুষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রচলিত সশস্ত্র সংঘাত, স্বাস্থ্য খাতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ, আয়বৈষম্য, শিক্ষার নিম্নহার, প্রাকৃতিক মহামারি, স্থূলতা, মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য। এসব ঝুঁকির প্রভাব মূল্যায়নে কমিশন ‘ডিজ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ার্স’ বা ড্যালিজ পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। এ পদ্ধতিতে রোগ, প্রতিবন্ধকতা ও অকালমৃত্যুর কারণে মানুষের সুস্থ জীবন থেকে সম্মিলিতভাবে কত বছর হারিয়ে যায়, তা হিসাব করা হয়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন হুমকির স্বাস্থ্যগত প্রভাব তুলনা করার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, জলবায়ু সংকট, অপুষ্টি, দূষণ ও ওষুধের কার্যকারিতা হারানোর মতো সমস্যাগুলোও দীর্ঘ মেয়াদে বিপুলসংখ্যক মানুষের সুস্থ জীবন কেড়ে নিতে পারে। এসব ঝুঁকির প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অপুষ্টি ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে, আর অন্যান্য অঞ্চলে অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। ভয় নয়, আগাম পদক্ষেপের আহ্বান কমিশনের সদস্য এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুবকর বলেন, গবেষণাটির উদ্দেশ্য মানুষকে আতঙ্কিত করা নয়; বরং ভবিষ্যতে মানবজাতি ও জনস্বাস্থ্যের সামনে কী ধরনের হুমকি আসতে পারে, তা তুলে ধরা। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের এসব সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হবে। তবে আগেভাগে পদক্ষেপ নিলে ঝুঁকিগুলোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। কমিশনের মূল্যায়নে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার উপযোগী করা, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উদীয়মান ঝুঁকি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা খাতের নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগকে সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো, ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতির বিলুপ্তি নিশ্চিত কোনো পূর্বাভাস নয়। এটি পারমাণবিক সংঘাত ও এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহারের মতো চরম ঝুঁকির সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্কতা। এসব ঝুঁকি কমাতে বর্তমান প্রজন্মের সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। **ট্যাগ:** ল্যানসেট, মানবজাতির বিলুপ্তি, পারমাণবিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এআইয়ের অপব্যবহার, বৈশ্বিক ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাণু অস্ত্র, জনস্বাস্থ্য