প্রকাশ :: ... | ... | ...

পুতিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে কিয়েভের পথে উইটকফ-কুশনার


সংযুক্ত ছবি

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতার পথ খুঁজতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিন ঘণ্টার বেশি সময় বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। শনিবার মস্কোর ক্রেমলিনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠককে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ‘ফলপ্রসূ’ ও ‘গঠনমূলক’ বলা হলেও বড় কোনো অগ্রগতির ঘোষণা আসেনি। মস্কোর বৈঠক শেষে আজ রোববার কিয়েভের উদ্দেশে যাওয়ার কথা রয়েছে উইটকফ ও কুশনারের। সেখানে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা করবেন তাঁরা। ফলে ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক তৎপরতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখন মস্কো নয়, কিয়েভ সফরেই হতে পারে। ### মস্কো বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক সহকারী ইউরি উশাকভ জানিয়েছেন, বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের সম্ভাব্য কয়েকটি উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিরা কিছু ধারণা ও প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। তবে সেগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। উশাকভের ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিন আলোচনায় যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার ‘বাস্তব অগ্রগতির’ কথা তুলে ধরেছেন এবং বলেছেন, মস্কো তার লক্ষ্য অর্জনে আত্মবিশ্বাসী। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধের ‘মূল কারণগুলো’ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকেই এ বক্তব্য দিয়ে আসছে। আলোচনায় শুধু যুদ্ধ নয়, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য বড় প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ক্রেমলিনের ভাষায়, দুই পক্ষের বৈঠক ছিল সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ। বৈঠকের শুরুতে পুতিনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, কঠিন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকার পরও ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানে ভূমিকা রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ### তাহলে বড় অগ্রগতি হলো না কেন মূল বাধা এখনো একই—ভূখণ্ড, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং ন্যাটো। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইউক্রেনকে রাশিয়ার দাবি করা চারটি অঞ্চলের পুরো ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে এবং ন্যাটোতে যোগদানের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করতে হবে। মস্কোর এ অবস্থান এখনো বদলায়নি। অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রক্ত ও বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে রক্ষা করা ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে রাজি নয়। কিয়েভের দৃষ্টিতে রাশিয়ার এমন শর্ত মেনে নেওয়া কার্যত আত্মসমর্পণের শামিল। বিশেষ করে দোনেৎস্ক নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান অত্যন্ত কঠিন। রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ দখলের লক্ষ্য নিয়ে সামরিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। ইউক্রেনও সেই ভূখণ্ড ছাড়ার বিষয়ে অনড়। ফলে যুদ্ধবিরতির মতো কোনো তাৎক্ষণিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে শুধু হামলা বন্ধের প্রশ্ন নয়, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং দখল করা ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েও সমাধান খুঁজতে হবে। ### যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা কূটনীতিকে কঠিন করে তুলছে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে। শুক্রবার কিয়েভে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সদর দপ্তরেও রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, হামলায় অন্তত ১২ জন আহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের মস্কো ও কিয়েভ সফরের ঠিক আগে এমন হামলা দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকটকেই সামনে এনেছে। অন্যদিকে, ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর লক্ষ্য রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতদের সফরকে কেবল কূটনৈতিক বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ কম। একই সঙ্গে এটি যুদ্ধক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি এবং আলোচনার টেবিলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার প্রতিযোগিতারও অংশ। ### কিয়েভ সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ মস্কোর পর কিয়েভে যাওয়া উইটকফ ও কুশনারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, রাশিয়ার অবস্থান সরাসরি শোনার পর তাঁরা ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলবেন। ফলে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের কোন অংশ মস্কো গ্রহণ করতে প্রস্তুত এবং কোন অংশে আপত্তি রয়েছে, তা ইউক্রেনের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, ট্রাম্প প্রশাসন যদি সত্যিই নতুন কোনো শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এগোতে চায়, তাহলে রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষকেই একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। ট্রাম্প শুক্রবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব’ রয়েছে। তবে এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তৃতীয়ত, ইউক্রেনকে কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে চাপ দেওয়া হবে কি না, কিংবা বিনিময়ে কিয়েভ কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাবে—এটাই আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি। ### সফরের নিরাপত্তাও ছিল আলোচনার অংশ দুই মার্কিন দূতের মস্কো ও কিয়েভ সফরের আগে নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা সমঝোতার প্রয়োজন হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, তাঁদের সফরের সময় রাশিয়া যেন কিয়েভে হামলা না চালায় এবং ইউক্রেনও যেন মস্কোতে হামলা না করে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল, মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরকে কেন্দ্র করে পুতিন রুশ বাহিনীকে কিয়েভে হামলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে আলোচনার নিরাপদ পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও এই কূটনৈতিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ### সময়ও গুরুত্বপূর্ণ এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুদ্ধ প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে চলছে এবং দুই পক্ষের সামরিক অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও হামলার তীব্রতা বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় এবং মানবিক ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনার চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি। আগস্টে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ করার একটি পরিকল্পনা নিয়ে ইউক্রেন মার্কিন আলোচকদের কাছে নিজেদের প্রস্তাব দিয়েছে। এবার ওয়াশিংটন একই সঙ্গে মস্কো ও কিয়েভের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। ফলে আগের উদ্যোগগুলোর তুলনায় বর্তমান সফরের গুরুত্ব বেশি। তবে মস্কোর বৈঠকের পর এখনো এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি যে রাশিয়া তার মূল দাবিগুলো থেকে সরে এসেছে। একইভাবে ইউক্রেনও ভূখণ্ড ছাড়ার বিষয়ে অবস্থান বদলানোর কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। তাই কিয়েভে উইটকফ ও কুশনারের আলোচনায় কী প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং জেলেনস্কি তাতে কী প্রতিক্রিয়া জানান, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মস্কোর বৈঠক যদি আলোচনার দরজা খোলার প্রথম ধাপ হয়ে থাকে, তাহলে কিয়েভ সফর হবে সেই দরজা দিয়ে বাস্তবে কতটা এগোনো সম্ভব—তার পরীক্ষা। আপাতত দুই পক্ষের দূরত্ব এতটাই বেশি যে যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির চেয়ে অন্তত আলোচনার কাঠামো তৈরি করাই ওয়াশিংটনের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য বলে মনে হচ্ছে।