কলকাতায় দুর্গাপূজা শুরু হলেই বেড়ে যায় তাঁদের ব্যস্ততা। কোথাও যানজট নিয়ন্ত্রণ, কোথাও দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো, আবার কোথাও অসুস্থ কাউকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া—সব দায়িত্বই পালন করেন তাঁরা। কেউ পথ হারালে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন। তাঁদের নাম মোহাম্মদ তাসলেম, শেখ শাহিদ ও মোহাম্মদ আলম। দুর্গাপূজার আনন্দ নির্বিঘ্ন করতে কলকাতার বেলগাছিয়ায় পূজামণ্ডপের আশপাশের রাস্তায় দায়িত্ব পালন করেন এই মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকেরা। তাঁদের কর্মকাণ্ডে উঠে আসে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কলকাতার উত্তরাঞ্চলের বেলগাছিয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৫ সালে গড়ে তোলা হয় ‘বেলগাছিয়া আমান কমিটি’। মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন উদ্যোগী ব্যক্তি কমিটিটি প্রতিষ্ঠা করেন। সম্প্রীতি রক্ষায় তাদের কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে পরে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজনও এতে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে কমিটিটি এলাকার দুর্গাপূজায় স্বেচ্ছাসেবামূলক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় কমিটির ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৫ জন স্বেচ্ছাসেবক বেলগাছিয়ার বড় বড় পূজামণ্ডপের আশপাশে দায়িত্ব পালন করেন। দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়লে তাঁরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা পারাপারে সহায়তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে যুক্ত হন। পূজা দেখতে আসা মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করেন তাঁরা। কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাস্টার শওকত ও সহকারী সম্পাদক ওয়াসিম খান জানান, এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তাঁদের ভাষ্য, এ উদ্যোগের ফলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মাস্টার শওকত বলেন, চলতি বছর চতুর্থীর দিন থেকে আমান কমিটির স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত তা চলবে। দুই পালায় স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করেন, যাতে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কাজে কোনো ঘাটতি না থাকে। কমিটির এক সম্পাদক বলেন, ‘আমরা শপথ নিয়েছি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেব না। আমাদের ওপর সাধারণ মানুষ আস্থা রেখেছে।’ দুর্গাপূজায় মানুষের ঢল নামলে দায়িত্বের পরিধিও বাড়ে। মাস্টার শওকত বলেন, ‘বিশ্বের এত বড় উৎসব আর কোথাও হয় না, এত মানুষ একসঙ্গে কোথাও প্যান্ডেলে ঘুরতে বেরোন না। সে জন্যই ইউনেস্কো হেরিটেজ সম্মান দিয়েছে কলকাতার দুর্গাপূজাকে।’ তিনি জানান, আগে স্বেচ্ছাসেবকেরা চার দিন দায়িত্ব পালন করতেন। এখন সেই সময় বেড়ে সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত হয়েছে। পূজার দিনগুলোতে তাঁরা কখনো নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে, কখনো পুলিশের সহযোগিতায় রাস্তায় দায়িত্ব পালন করেন। ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। আমান কমিটির কাজ শুধু যানবাহন ও ভিড় নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়। রাস্তার পাশে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে মাইকের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সচেতন করা হয়। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে প্রাথমিক সহায়তা দেওয়া হয় এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভিড়ের মধ্যে শিশু বা অন্য কেউ হারিয়ে গেলে তাঁকে খুঁজে পেতেও সহযোগিতা করেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। এভাবেই উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেন তাঁরা। সম্প্রতি কলকাতার চোরবাগানের একটি দুর্গাপূজাকে ঘিরে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনা উৎসবের ভিড় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বেলগাছিয়ায় আমান কমিটির দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে কোনো এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়; সুশৃঙ্খল ভিড় ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। বেলগাছিয়া সর্বজনীন কেন্দ্রীয় দুর্গোৎসব কমিটির সভাপতি ডা. প্রসূন কুমার ঘোষ আমান কমিটির কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আমান কমিটি যেহেতু বেলগাছিয়ার রাস্তায় আছে, তাই বেলগাছিয়া এলাকায় কখনো দুর্ঘটনা হবে না। ৪২ বছর বেলগাছিয়ার মানুষের সেবা করছে আমান কমিটি। আমি এই কমিটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’ হিন্দু-মুসলিম পরিচয়ের বিভাজনের পরিবর্তে মানুষের অভিন্ন পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলিম বলি না, আমরা বলি আমাদের রক্তের রং এক।’ বেলগাছিয়া আমান কমিটির কার্যক্রম দেখিয়ে দেয়, ধর্মীয় উৎসব কেবল একটি সম্প্রদায়ের আনন্দের উপলক্ষ নয়; তা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও সুযোগ। দুর্গাপূজার মতো বৃহৎ আয়োজনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নেওয়া সম্প্রীতির বাস্তব উদাহরণ। উৎসবের ভিড়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিরাপত্তায় সহযোগিতা করা এবং বিপদে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই এই স্বেচ্ছাসেবকেরা বারবার তুলে ধরছেন—ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানবিক দায়িত্ব সবার।