চারদিকে শুধু অন্ধকার। বাইরে কী ঘটছে, তার কোনো খবর নেই। উদ্ধারকারীরা আসবেন কি না, এলেও কখন আসবেন—কিছুই জানতেন না তাঁরা। শুধু জানতেন, ভয়াবহ বন্যা আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কোথাও সুড়ঙ্গের গভীরে আটকে আছেন তাঁরা। এভাবেই কেটে গেছে এক দিন, দুই দিন করে নয়টি দিন। নেপালের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আটকে পড়া মেকানিক্যাল ফোরম্যান সঞ্জয় শাহ ও মেকানিক্যাল সুপারভাইজার কবির মহার্জনের কাছে এই নয়টি দিন ছিল জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। বাইরে তখন স্বজনদের উৎকণ্ঠা, নিখোঁজের তালিকায় প্রিয়জনের নাম এবং প্রতিটি ফোনকলের অপেক্ষা। অবশেষে শুক্রবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়। দীর্ঘ নয় দিন পর উদ্ধারকারীরা তাঁদের কাছে পৌঁছান। জীবিত অবস্থায় সুড়ঙ্গ থেকে বের করে আনা হয় সঞ্জয় ও কবিরকে। পরে হেলিকপ্টারে তাঁদের কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়। নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট তাঁদের উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে উঠে এসেছে ভয়াবহ বন্যার মধ্যে তাঁদের বেঁচে থাকার গল্প। আছে সহকর্মীদের আগে নিরাপদে বের করে দিতে গিয়ে নিজের বের হওয়ার সুযোগ হারানো সঞ্জয়ের কথা। আছে পরিবারের সঙ্গে শেষ ফোনালাপের স্মৃতি। আর আছে নয় দিন পর প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার অবিশ্বাস্য স্বস্তি। ‘শেষ পর্যন্ত আমি বের হতে পারিনি’ সপ্তরী জেলার ৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মী। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর বরফ, কাদা ও পাথরের ভয়াবহ ঢল নেমে আসে। তখন ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের কন্ট্রোল রুমে দায়িত্ব পালন করছিলেন সঞ্জয়। হঠাৎ প্রকল্প এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। ভূগর্ভস্থ অংশে থাকা কর্মীরা তখন প্রাণ বাঁচাতে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই মুহূর্তে নিজের জীবনের চেয়েও সহকর্মীদের নিরাপদে বের করে আনার বিষয়টি সঞ্জয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্ধারের পর সেনাবাহিনীর চিকিৎসকদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সঞ্জয় জানান, সাধারণ সময়ে ওই এলাকায় পাঁচ-ছয়জন কর্মী থাকতেন। কিন্তু সেদিন সেখানে ছিলেন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন। তিনি সবাইকে দ্রুত বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। অন্যদের বের হতে সহায়তা করতে গিয়ে নিজের বের হওয়ার সময় ফুরিয়ে যায়। “শেষ পর্যন্ত আমি বের হতে পারিনি”—উদ্ধারের পর সেনা কর্মকর্তাদের এ কথাই বলেন সঞ্জয়। তারপর শুরু হয় নয় দিনের অপেক্ষা। সুড়ঙ্গের অন্ধকারে এই দীর্ঘ সময় কীভাবে কেটেছে, তা-ও জানিয়েছেন তিনি। মন্ত্র জপতে জপতেই সময় পার করেছেন সঞ্জয়। চিকিৎসকদের তিনি বলেন, “আমি কন্ট্রোল রুমে কাজ করতাম। সবাইকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল।” সঞ্জয়ের ধারণা, ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনার আরও গভীরে হয়তো অন্য কেউ আটকে থাকতে পারেন। নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া সঞ্জয় শাহ। ছবি: রয়টার্স শেষ ফোনটি ছিল বন্যার আগেই সঞ্জয়ের পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল ২৬ আগস্ট সকালে। সকাল সাতটার দিকে বোন সুধার সঙ্গে প্রায় তিন মিনিট কথা বলেন তিনি। তখনও পরিবারের কেউ বুঝতে পারেননি, সেটিই হতে যাচ্ছে সঞ্জয়ের সঙ্গে শেষ যোগাযোগ। ভিডিও কলে সঞ্জয় পরিবারের সদস্যদের প্রকল্পের ভেতরের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দেখিয়েছিলেন। এরপর জানান, তাঁকে কাজে ফিরতে হবে। ফোন রেখে দেন তিনি। এরপর একসময় তাঁর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। দিন গড়াতে থাকে। সঞ্জয়ের পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে ছুটতে থাকেন। প্রতিটি জায়গা থেকে তাঁরা একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন—সঞ্জয় কোথায়? নয় দিন পর শুক্রবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়। খবর আসে, সঞ্জয়কে জীবিত পাওয়া গেছে। স্বজনদের কাছে এ যেন অবিশ্বাস্য এক খবর। খবর পেয়েই পরিবারের সদস্যরা কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা হন। কবিরের গল্পও কম বিস্ময়কর নয় সঞ্জয়ের মতো কবির মহার্জনও ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থায়ী কর্মী নন। কাঠমান্ডুর কীর্তিপুরের বাসিন্দা কবির কুলেখানি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ত্রিশূলি-৩এতে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাই আমিরের ভাষ্য অনুযায়ী, নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কবিরের কাজের অভিজ্ঞতা ১৫ বছরের বেশি। বন্যার এক দিন আগে, ২৫ আগস্ট সকালে কাজের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন কবির। পরদিন সকালে স্ত্রী হীরা শোভার সঙ্গে শেষবার কথা হয় তাঁর। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ফোনে স্ত্রীকে জানান, সহকর্মীদের সঙ্গে নাশতা করে ভূগর্ভস্থ অংশে কাজে যাবেন। সেখানে গেলে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ নাও থাকতে পারে—স্ত্রীকে আগেই সে কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। তারপর আর কোনো ফোন আসেনি। ফোন বন্ধ পাওয়ার পর পরিবারের উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে। স্বজনেরা পরদিন নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরে গিয়ে কবিরের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানান। কর্মকর্তারা তাঁদের জানান, উদ্ধার অভিযান চলছে। সেই কথায় পরিবারের মনে ক্ষীণ হলেও আশা জাগে—হয়তো কবির বেঁচে আছেন। নয় দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার পাওয়া কবির মহার্জন। ছবি: রয়টার্স নয় দিনের অন্ধকার বন্যার পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ত্রিশূলি-৩এ প্রকল্পের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর সঙ্গে বাইরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভেতরে কতজন আটকা পড়েছেন, তাঁদের অবস্থা কী—তা নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। এতে নেপাল পুলিশ, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী, কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হন। দিন পেরিয়ে যায়। একের পর এক জায়গায় তল্লাশি চলে। ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়, খোঁজা হয় ভূগর্ভস্থ পথ। স্বজনদের অপেক্ষাও দীর্ঘ হতে থাকে। অবশেষে শুক্রবার উদ্ধারকারীরা পৌঁছান সঞ্জয় ও কবিরের কাছে। নয় দিন ধরে অন্ধকারে আটকে থাকার পর তাঁরা তখনও জীবিত। প্রথমে ঘটনাস্থলেই তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়। কবিরের অবস্থা গুরুতর। তাঁকে বীরেন্দ্র সৈনিক হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর পায়ে আঘাত রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্ত্রী হীরা। সঞ্জয়ের অবস্থা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকেও সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে কবির মহার্জনকে দেখে আসার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি তার স্ত্রী হীরা শোভা মহার্জন। ছবি: রয়টার্স ‘বড্ড তৃষ্ণা’ নয় দিনের উৎকণ্ঠার পর হাসপাতালে স্বামীকে দেখতে যান হীরা। দীর্ঘ অন্ধকার আর অনিশ্চয়তার পর কবির তাঁর স্ত্রীকে চিনতে পারেন। বেশি কথা বলার মতো শারীরিক অবস্থায় তখন তিনি ছিলেন না। তবু স্ত্রীকে দেখে কয়েকটি শব্দ বলতে পেরেছিলেন। “বড্ড তৃষ্ণা।” এই সামান্য কথাটুকুই যেন নয় দিনের অপেক্ষার পর হীরার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। হীরা বলেন, “সে আমাকে চিনতে পেরেছে। আমার সঙ্গে কথা বলেছে, কিন্তু বেশি কথা বলার মতো অবস্থায় ও নেই। আনন্দের কান্না আমি থামাতে পারিনি।” নেপালের ত্রিশূলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বন্যার পর নয় দিন ধরে আটকে থাকা সঞ্জয় ও কবিরের উদ্ধার তাই শুধু একটি উদ্ধার অভিযান সফল হওয়ার গল্প নয়। এটি সহকর্মীদের বাঁচাতে গিয়ে নিজের পথ হারানো এক কর্মীর গল্প, শেষ ফোনকলের পর স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প এবং ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষার গল্প।