প্রকাশ :: ... | ... | ...

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান আবার ভারতের অংশ হবে: রামদেবের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক


সংযুক্ত ছবি

রামদেবের এই মন্তব্য শুধু একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস, ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণা, বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের বিস্তার এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। বিষয়টি তাই শুধু তিনি কী বলেছেন, তা নয়—কেন এমন কথা বলা হচ্ছে এবং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একদিন আবার ভারতের অংশ হবে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের বিতর্কিত যোগগুরু রামদেব। এ জন্য ভারতীয়দের ‘একটু ধৈর্য’ ধরার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছত্তিশগড়ের রায়পুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় রামদেব এ মন্তব্য করেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতন ও অবিচারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরপরই ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে রামদেব বলেন, একদিন এমন সময় আসবে, যখন পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান আবার ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে। তিনি ভারতীয়দের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। রামদেবের বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এনেছে ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণাকে। ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরের অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তবে ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতা এক নয়। ব্রিটিশ শাসনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে মৌর্য, মুঘলসহ নানা সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। কিন্তু সেই রাজনৈতিক সীমানাগুলো কখনোই বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সীমানার সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নিজস্ব রাজনৈতিক ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় ও সার্বভৌমত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। প্রায় ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ এবং দীর্ঘ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশকে ‘আবার ভারতের অংশ’ হিসেবে দেখার ধারণা তাই দেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রামদেব তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছেন। তবে কোনো দেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সেটি সেই দেশের সার্বভৌমত্ব বা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব পরিবর্তনের যুক্তি হয়ে উঠতে পারে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সীমান্ত—তিনটি ভিন্ন বিষয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান কূটনৈতিক চাপ, আইনি ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে পারে। কিন্তু সেই যুক্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রামদেবের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ‘আবার’ ভারতের অংশ হওয়ার কথা বলেছেন। এই ‘আবার’ শব্দের মধ্যেই রয়েছে একটি বৃহত্তর সভ্যতাগত ধারণা। ভারতের জাতীয়তাবাদী চিন্তার একটি ধারায় বর্তমান রাজনৈতিক সীমান্তের চেয়ে প্রাচীন ইতিহাস ও সভ্যতাগত যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশকে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সভ্যতার মানচিত্র আর রাষ্ট্রের মানচিত্র এক নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বহু মিল রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেও রয়েছে দীর্ঘ অভিন্ন ইতিহাস। আফগানিস্তানের সঙ্গেও ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সম্পর্ক বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীন পরিচয় বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তকে অস্বীকার করে না। বাস্তব রাজনৈতিক পরিস্থিতিও রামদেবের ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে মিলছে না। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। আফগানিস্তানের নিজস্ব রাজনৈতিক, জাতিগত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে। এই তিনটি দেশ ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে একীভূত হবে—এমন কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা বাস্তব সম্ভাবনা বর্তমানে দৃশ্যমান নয়। ভারত সরকারেরও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার কোনো আনুষ্ঠানিক নীতি নেই। ফলে রামদেবের বক্তব্যকে ভারতের সরকারি অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তাঁর মন্তব্যকে পুরোপুরি গুরুত্বহীন বলেও উড়িয়ে দেওয়া কঠিন। কারণ ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে বৃহত্তর ভারত বা ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণা নতুন নয়। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও জাতীয়তাবাদী সংগঠনের নেতারা ইতিহাস ও সভ্যতার প্রসঙ্গ টেনে বর্তমান সীমান্ত নিয়ে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের বক্তব্যের বাস্তবায়নের সম্ভাবনা না থাকলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে যখন ধর্মীয় পরিচয়, ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় সীমান্তকে একই বক্তব্যের মধ্যে যুক্ত করা হয়। রামদেব অবশ্য শুধু ভূখণ্ড নিয়ে মন্তব্য করেননি। ধর্মান্তর ঠেকাতে ছত্তিশগড়ে নেওয়া আইন নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ভারতে হিন্দু, মুসলিম বা খ্রিষ্টান—কোনো ধর্মই হুমকির মুখে নেই। হুমকির মুখে রয়েছে ভারতের সম্মান ও মর্যাদা। তিনি বলেন, ভারতে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে সেই স্বাধীনতা সংবিধান ও নৈতিকতার সীমার মধ্যে থাকা উচিত। ভারতকে বিশ্বের সেরা গণতন্ত্রে পরিণত করার কথাও বলেন রামদেব। তাঁর ভাষায়, তিনি চান ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের সেরাদের একটি হোক, ভারতীয় মুদ্রা শক্তিশালী হোক এবং দেশটির পাসপোর্ট এতটাই শক্তিশালী হোক যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভারতীয়দের ভিসার প্রয়োজন না হয়। তবে তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী। দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা বলছে, এ অঞ্চলের প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়, রাজনৈতিক ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও দুই দেশ দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। একইভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের নিজস্ব জটিলতা রয়েছে। সে কারণে রামদেবের বক্তব্যকে বাস্তব রাজনৈতিক পূর্বাভাসের চেয়ে একটি আদর্শিক অবস্থান হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ইতিহাসের মানচিত্রকে কত দূর পর্যন্ত বর্তমানের রাজনৈতিক ভাষায় ব্যবহার করা যায়। কারণ উপমহাদেশের ইতিহাসে সাম্রাজ্যের সীমানা বারবার বদলেছে। কিন্তু আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক সংগ্রাম, জাতীয় পরিচয় এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট। ১৯৭১ সালে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার ভিত্তি কোনো পুরোনো সাম্রাজ্যের মানচিত্র নয়। এর ভিত্তি ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার। সে কারণেই কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যদ্বাণী বাংলাদেশের মানচিত্র বদলাবে কি না, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কি অতীতের সাম্রাজ্যিক ধারণায় নির্ধারিত হবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে। রামদেবের বক্তব্য সেই পুরোনো বিতর্কটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।