দিল্লির রাজপথে তখন উত্তেজনা। সামনে পুলিশের ব্যারিকেড, এক পাশে বিক্ষোভকারীরা, অন্য পাশে পুলিশ। এর মধ্যেই ব্যারিকেডের ওপর উঠে বসেছিলেন এক তরুণী। হাতে মাইক, কণ্ঠে স্লোগান। কিছুক্ষণ পর তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে আটকও করা হয়। এই তরুণীর নাম নেহা বোরা। গত কয়েক মাসে ভারতের বিভিন্ন ছাত্র ও যুব আন্দোলনে বারবার দেখা গেছে তাঁকে। কখনো অনশন মঞ্চে, কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে, আবার কখনো পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ থেকে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম, এরপর ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর—ইস্যু বদলেছে, কিন্তু রাজপথে নেহার উপস্থিতি বদলায়নি। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) জাতীয় সভাপতি নেহা এখন ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র ও যুব আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে গত কয়েক মাসে তাঁর পরিচিতি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয়েছে দিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন ঘিরে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে তাঁকে। কয়েক দফায় তাঁকে আটকও করেছে দিল্লি পুলিশ। ২৩ দিনের অনশন থেকে রাজপথে নেতৃত্ব নেহার পরিচিতি অবশ্য সাম্প্রতিক নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া ছাত্র-যুব আন্দোলনে তিনি টানা ২৩ দিন অনশন করেন। শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী সোনম ওয়াংচুকসহ আরও কয়েকজন ওই কর্মসূচিতে ছিলেন। পরীক্ষাব্যবস্থা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনের পরিধি পরে আরও বিস্তৃত হয়। শিক্ষা, সরকারি জবাবদিহি এবং আন্দোলনকারীদের প্রতি পুলিশের আচরণসহ নানা বিষয় সামনে আসে। ওই সময় নেহা আন্দোলনের অন্যতম নিয়মিত বক্তা হিসেবে পরিচিতি পান। তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের অভিযোগে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে রাঁচিতে যান তিনি। সেখানে তাঁর মুখে কালি ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটে। এতে আন্দোলন থেকে সরে যাননি নেহা। পরে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা তাঁকে ভয় দেখাতে পারবে না। দিল্লির বিভিন্ন বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিচার্জ ও প্যালেট ব্যবহারের মুখেও তাঁকে আন্দোলনে দেখা গেছে। পরে বিহারে গিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতেও কর্মসূচিতে অংশ নেন। একের পর এক আন্দোলনে যুক্ত হতে হতে নেহা এখন ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের দৃশ্যমান মুখগুলোর একজন। এবার ভোটার তালিকা নিয়ে লড়াই নেহার সাম্প্রতিক আন্দোলনের বিষয়টি আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত। ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা বা এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হলো, ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধনের মাধ্যমে তালিকাকে আরও নির্ভুল ও হালনাগাদ করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। এই বিতর্কের মধ্যেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে আন্দোলনে নামে আইসাসহ বিভিন্ন ছাত্র ও নাগরিক সংগঠন। ২ অক্টোবর শুরু হওয়া আন্দোলনে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। পরদিনও বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে নেহাও ছিলেন। ৪ অক্টোবর তাঁকে একটি চিহ্নহীন গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁকে নরেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া থানায় ছেড়ে দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পুলিশ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগও করা হয়েছে। বামপন্থী রাজনীতির পরিচিত মুখ নেহার বেড়ে ওঠা উত্তরাখণ্ডে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করার পর তিনি আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন। তিনি সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন আইসার জাতীয় সভাপতি। ভারতের ছাত্ররাজনীতিতে আইসা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। সংগঠনের নেতৃত্বে এসে নেহা সাম্প্রতিক বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি যন্তর মন্তরের আন্দোলনকে ‘অরাজনৈতিক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর মতে, আন্দোলনে শিক্ষা, চাকরি, জবাবদিহি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠে আসে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গেই যুক্ত। অন্য এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেছেন, বিভিন্ন ছাত্র আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর মতে, এসব আন্দোলনের পেছনে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। বিজেপি-সমর্থক পরিবারের মেয়ে নেহার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক পটভূমিও আলোচনায় এসেছে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিজেপির সমর্থক রয়েছেন। ফলে দিল্লিতে এসে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক মতপার্থক্য তৈরি হয়। ‘ফ্রন্টলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা জানান, তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তাঁর নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। তবে সেই মতপার্থক্য তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে থামাতে পারেনি। বরং আন্দোলনের সময় তাঁর মা একপর্যায়ে দিল্লিতে এসে পুলিশের পদক্ষেপ ও আন্দোলনের পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেন। পরে আন্দোলনকারীদের ভূমিকার প্রশংসাও করেন বলে নেহা জানিয়েছেন। তাঁর কাছে এটি পারিবারিক মতপার্থক্যের মধ্যেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক উপলব্ধির একটি উদাহরণ। অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা নেহার পরিচিতির সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির আন্দোলনেরও যোগ রয়েছে। এই আন্দোলনের পরিচিত মুখ অভিজিৎ দীপক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই নেহা ও অভিজিৎকে তুলনা করছেন। তবে নেহা এই তুলনাকে গুরুত্ব দিতে চান না। তাঁর অবস্থান—ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার চেয়ে আন্দোলনে ঐক্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষায়, ‘তুলনা নয়, সংহতি।’ এই অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি নিজেকে কোনো একটি আন্দোলনের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিভিন্ন ছাত্র ও যুব আন্দোলনের মধ্যে যোগসূত্র তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সামনে আরও বড় পরিসর? নেহার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে যাবেন কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে। তবে আপাতত তাঁর সক্রিয়তার কেন্দ্র ছাত্র ও তরুণদের বিভিন্ন দাবি এবং সেগুলোকে বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করা। নিট থেকে সরকারি চাকরির পরীক্ষা, সেখান থেকে ভোটার তালিকা—ইস্যু বদলেছে, কিন্তু নেহার রাজপথ বদলায়নি। পুলিশের ব্যারিকেড, অনশন মঞ্চ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশ কিংবা দিল্লির রাজপথ—গত কয়েক মাসে প্রায় সব জায়গাতেই দেখা গেছে তাঁকে। ফলে ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলনে যে নতুন নেতৃত্ব সামনে আসছে, নেহা বোরা তাঁদের মধ্যে দৃশ্যমান মুখগুলোর একজন হয়ে উঠেছেন। তাঁর রাজনৈতিক পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে আন্দোলনের মাঠে তাঁর সক্রিয়তা যে তাঁকে ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ের পরিচিতিতে নিয়ে এসেছে, তা স্পষ্ট।