এক মাসে একাধিক জেলায় প্রাণহানি, ফেব্রুয়ারি থেকে নিহত ৫০ ছাড়ানোর তথ্য; অবরোধ প্রত্যাহার হলেও থামেনি হামলা, দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ভারতের মণিপুরে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২০২৩ সাল থেকে চলা সংঘাতের পাশাপাশি নতুন করে তীব্র হয়েছে কুকি-নাগা সহিংসতা। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে চার তাংখুল নাগা ও দুই নাগা বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর পার্বত্য জেলাগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন হামলাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কুকি-নাগা সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। ফলে মণিপুরের সংকট এখন আর শুধু মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কামজং জেলার ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পিলং নাগা গ্রামে সশস্ত্র হামলায় চার তাংখুল নাগা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের বাবা-ছেলেও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলাকারীরা সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য হতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মিয়ানমারভিত্তিক কুকি ন্যাশনাল আর্মি-বর্মা বা কেএনএ-বির সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফল ছাড়া কোনো সংগঠনকে এ হামলার জন্য দায়ী করা যায় না। এর পরদিন, ২৬ সেপ্টেম্বর সেনাপতি জেলার কালেনজাং গ্রামে গুলিতে আরও দুই নাগা বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পুলিশ জানায়, অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাঁদের ওপর গুলি চালায়। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলাটি ঘটে নাগা সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিলের (ইউএনসি) অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। ফলে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সেপ্টেম্বরের অন্য ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তামেংলং জেলার তামেই এলাকায় ২১ সেপ্টেম্বর ১৭ বছর বয়সী লিয়াংমাই নাগা শিক্ষার্থী এনকে উইফেনবোকে গুলি করে হত্যার খবর পাওয়া যায়। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর লেইজাংফাই এলাকায় মাঠে কাজ শেষে ফেরার পথে দুই কুকি-জো নারী নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরজুড়ে তামেংলং, কামজং, সেনাপতি, নোনেই ও কাঙপোকপি জেলায় পৃথক হামলায় একাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ সহিংসতা কোনো একটি গ্রাম বা জেলার মধ্যে আটকে নেই; বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু কুকি-নাগা সংঘাত কেন বাড়ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ভূমি, বসতি, আঞ্চলিক প্রভাব, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং ১৯৯০-এর দশকের রক্তাক্ত ইতিহাস—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ কয়েক দশকের পুরোনো। অতীতে সংঘর্ষে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। সেই ইতিহাসের স্মৃতি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো স্থানীয় রাজনীতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। বর্তমান সংঘাতের নতুন পর্যায়ের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উখরুল জেলার লিটন এলাকায় বিরোধ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং পরবর্তী পাল্টাপাল্টি হামলার কথা উঠে এসেছে। এরপর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। তবে একটি মাত্র ঘটনাকে পুরো সংঘাতের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। ভূমি ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরোনো বিরোধ, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিযোগিতা এবং প্রতিশোধের প্রবণতা পরিস্থিতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভৌগোলিক বাস্তবতাও সংঘাত নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলেছে। উখরুল, কামজং, সেনাপতি ও তামেংলংয়ের মতো পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন এলাকায় নাগা ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর বসতি পাশাপাশি বা কাছাকাছি। ফলে একটি এলাকায় হামলা হলে তার প্রতিক্রিয়া অন্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মিয়ানমার সীমান্তের নৈকট্যও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সীমান্তপারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্ভাব্য তৎপরতার অভিযোগ উঠলেও প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের পরিচয় ও ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো ঘিরে দুই পক্ষের সংগঠনগুলোর অভিযোগও সংঘাত প্রশমনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগা সংগঠনগুলোর একাংশ কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ তুলছে। বিশেষ করে মে মাসে ছয় নাগা বেসামরিক নাগরিক অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় বিচার দাবি করে ইউএনসি দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। অন্যদিকে কুকি-জো সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাগা-প্রধান এলাকায় অবরোধ ও চলাচলে বাধার কারণে খাদ্য, ওষুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহে সমস্যার অভিযোগ করা হয়েছে। এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি; প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা স্বাধীন তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ বা এসওও চুক্তি। ভারত সরকার ও মণিপুর সরকারের সঙ্গে কিছু কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীর এই চুক্তি নিয়ে নাগা সংগঠনগুলোর আপত্তি রয়েছে। ইউএনসি চুক্তি বাতিল এবং সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটিতে কেন্দ্রীয় সরকার, মণিপুর সরকার ও ইউএনসির মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর সংগঠনটি অর্থনৈতিক অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। আলোচনায় ছয় নিহত নাগার পরিবারের জন্য সহায়তা এবং অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে অবরোধ প্রত্যাহার মানেই সংঘাতের মূল বিরোধগুলোর নিষ্পত্তি নয়। অর্থনৈতিক অবরোধের প্রভাবও ছিল ব্যাপক। জাতীয় মহাসড়কগুলোতে পণ্যবাহী যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ইম্ফল উপত্যকা ও কুকি-জো অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকার সরবরাহব্যবস্থায় চাপ পড়ে। খাদ্য, ওষুধ ও জরুরি পণ্য পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কামজং জেলায় কুকি নাগরিক সংগঠনগুলোর পাল্টা অবরোধের ঘটনাও পরিস্থিতির জটিলতা বাড়ায়। ফলে সড়ক যোগাযোগ ও নিত্যপণ্যের সরবরাহও দুই সম্প্রদায়ের বিরোধের অংশ হয়ে ওঠে। বৃহত্তর মণিপুর সংকটের প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের মে থেকে মেইতেই ও কুকি-জো জনগোষ্ঠীর সংঘাতে ২৬০ জনের বেশি নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে কুকি-নাগা সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় রাজ্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাস আরও বাড়ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে কর্তৃপক্ষ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকলেও সংঘাতের গভীর কারণগুলোর স্থায়ী সমাধান কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জরুরি হলো সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অবরোধ, চলাচলে বাধা ও প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু সাময়িক সমঝোতা বা সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার দিয়ে দীর্ঘদিনের ভূমি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিরোধ মিটবে না। নাগা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে ধারাবাহিক সংলাপ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি না হলে মণিপুরের পার্বত্য এলাকায় সহিংসতার এই চক্র আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে।