প্রকাশ :: ... | ... | ...

মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কে এই ফাতিমা জাহরা


সংযুক্ত ছবি

মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি। গত ২৩ সেপ্টেম্বরের সংসদ নির্বাচনে তাঁর দল অথেনটিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (পিএএম) সর্বোচ্চ আসন পাওয়ার পর মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) তাঁকে সরকারপ্রধান নিয়োগ দেন দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। ৫০ বছর বয়সী এই রাজনীতিককে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। মরক্কোর সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পাওয়া দলের মধ্য থেকেই রাজা সরকারপ্রধান নিয়োগ দেন। ৩৯৫ আসনের পার্লামেন্টে পিএএম পেয়েছে ৯৭টি আসন। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৯৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দলটির নেই। ফলে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করে জোট সরকার গঠন করতে হবে এল মানসুরিকে। আরব বিশ্বের সরকারপ্রধানদের ইতিহাসেও তাঁর নিয়োগ তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে তিউনিসিয়ার নাজলা বোদেন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এল মানসুরি সেই অঞ্চলে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পাওয়া দ্বিতীয় নারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর সামনে এখন নারী নেতৃত্বের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের পাশাপাশি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জনসেবার মতো বিষয়েও কাজ করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফাতিমা জাহরা এল মানসুরি পেশায় আইনজীবী। তিনি রাজধানী রাবাতের মোহাম্মদ পঞ্চম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা ও করপোরেট আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৮ সালে পিএএম প্রতিষ্ঠার পর তিনি দলটির রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০৯ সালে মারাকেশের মেয়র নির্বাচিত হন এবং ২০২১ সালে আবারও ওই দায়িত্ব পান। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারেও কাজ করেছেন এল মানসুরি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখানুচের সরকারে তিনি গৃহায়ন ও নগর উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পিএএম একক সভাপতির পরিবর্তে সম্মিলিত নেতৃত্বের কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে; এল মানসুরি ওই নেতৃত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের আগে পিএএমের ভেতরে সম্ভাব্য সরকারপ্রধান হিসেবে আলোচনায় ছিলেন দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ফাউজি লেকজাও। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর এল মানসুরি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত রাজার। শেষ পর্যন্ত রাজা তাঁকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। মরক্কোর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাজার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হলেও জাতীয় নিরাপত্তা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়ে রাজার উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। ফলে নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব শুধু সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি করায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজতন্ত্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার পরিচালনাও হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এল মানসুরির রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি দিক হলো, তিনি নিজেকে ‘লৌহমানবী’ হিসেবে পরিচিত করার প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দেন না। অতীতে নিজের সম্পর্কে তিনি স্বাধীন ও সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ রয়েছে। তবে নারী অধিকার, পারিবারিক আইন এবং সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের মতো বিতর্কিত বিষয়ে তাঁর প্রকাশ্য অবস্থান তুলনামূলকভাবে সীমিত। এসব বিষয়ে ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ছবি: এএফপি নির্বাচনে পিএএম সর্বাধিক আসন পেলেও দলটিকে এককভাবে সরকার পরিচালনার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি ভোটাররা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল র‍্যালি অব ইন্ডিপেন্ডেন্টস (আরএনআই) পেয়েছে ৬৬টি আসন এবং ইস্তিকলাল পার্টি পেয়েছে ৬৫টি। ফলে জোট গঠনের আলোচনায় এ দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদেলিলাহ বেনকিরানের নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (পিজেডি) এবার ৫৪টি আসন পেয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি মাত্র ১৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবারের নির্বাচনে তাদের আসন বৃদ্ধি দলটির সংসদীয় উপস্থিতি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও পিএএমের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা কম বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। মরক্কোর নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক চাপ ও তরুণদের অসন্তোষ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ গত বছর তরুণদের বিক্ষোভে প্রকাশ পেয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের অনাগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিও নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব। স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য মরক্কোকে অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটন খাতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফাতিমা জাহরা এল মানসুরির নিয়োগ মরক্কোর রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। তবে তাঁর সরকারের সাফল্য নির্ভর করবে জোট গঠন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, জনসেবার উন্নয়ন এবং নাগরিকদের প্রত্যাশা পূরণের ওপর। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন তাঁর সামনে প্রতীকী অর্জনকে বাস্তব নীতিগত অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার পরীক্ষা।