বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের আবারও ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে মিয়ানমার সরকার। একই সঙ্গে দেশটিতে ‘রোহিঙ্গা’ নামে কোনো জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই বলেও দাবি করেছে তারা। মিয়ানমারের এই বক্তব্যের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ যখন আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন হঠাৎ করে পরিচয়ের বিতর্ক সামনে আনছে কেন মিয়ানমার? বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মিয়ানমার সরকার যে সত্যিকার অর্থে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী নয়, সেটিই নতুন করে বোঝাতে চেয়েছে। তাঁদের মতে, রোহিঙ্গাদের নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করা মিয়ানমারের পুরোনো অবস্থান। নতুন বিবৃতিতে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়েছে। এতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত নূরুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গারা রাখাইনে জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছেন। এখন মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—কেউই তাঁদের ফিরিয়ে নিতে চায় না। মিয়ানমার সরকারের নতুন বিবৃতিতেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে। মিয়ানমার ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি দেয় না। দেশটির সরকার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে আসছে। এবারও তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অন্য দেশে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের এমন একটি জাতিগত পরিচয়ে পরিচিত করা হচ্ছে, যা মিয়ানমারে কখনো ছিল না। অর্থাৎ রোহিঙ্গা পরিচয়কে অস্বীকার করার অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা তিন লাখের কিছু বেশি ‘বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাদের। একই সঙ্গে আরাকান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে স্বীকার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের হিসাবের বড় পার্থক্য রয়েছে। মিয়ানমারের দাবি, ২০১৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে আরসা নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালানোর পর রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে সংঘাত শুরু হয়। তাদের হিসাবে, ওই হামলার আগে বুথিডং, মংডু ও রাথিডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ‘বাঙালি’ বসবাস করত। সংঘাতের পর তাঁদের মধ্যে দুই লাখের বেশি সেখানে থেকে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশে চলে যায়। এই হিসাবের ভিত্তিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয় বলে মনে করে মিয়ানমার। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্টের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। এর আগে ও পরে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ ৮৯ হাজার। মিয়ানমারের বিবৃতিতে বাংলাদেশের দেওয়া প্রত্যাবাসন তালিকা নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। দেশটির দাবি, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে মিয়ানমার। যাচাই হওয়া বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের দ্রুত ফিরিয়ে নিতে ‘আন্তরিক সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ চলছে বলেও বিবৃতিতে জানিয়েছে দেশটি। তবে মিয়ানমারের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ। বিবৃতির চার দিন পর ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা চায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সাংবাদিকদের বলেন, মিয়ানমারের বিবৃতির সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। রোহিঙ্গাদের নিজেদের পরিচয় রয়েছে এবং সেই পরিচয় নিয়েই তাঁদের ফিরে যেতে হবে। শামা ওবায়েদ বলেন, প্রত্যাবাসন শুরু করার লক্ষ্যেই মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতও তাঁর সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় চীন সরকারও বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য তারা মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে। মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, ‘বাঙালি’ না ‘রোহিঙ্গা’—এই বিতর্কে বাংলাদেশের জড়ানো উচিত নয়। বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত, মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে হবে। তাঁর মতে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ঠেকানোর জন্যই মিয়ানমার বিবৃতির মাধ্যমে নতুন একটি কৌশল সামনে এনেছে। মিয়ানমারের এমন অবস্থানের পেছনে আঞ্চলিক রাজনীতিরও ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে করেন এমদাদুল ইসলাম। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার প্রকৃত অর্থে এমন উদ্যোগ চায় না—নতুন করে বিতর্ক তৈরির পেছনে সেটিও একটি কারণ হতে পারে। মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজের মতে, মিয়ানমার মূলত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে চাইছে। তাঁর মতে, দেশটির এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় সরকারের কর্তৃত্ব রয়েছে। রাখাইনে মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই; বড় অংশ আরাকান আর্মির হাতে। ফলে সেখানকার বাস্তবতা আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। আলতাফ পারভেজ বলেন, মিয়ানমার সরকার এখন রোহিঙ্গাদের যুদ্ধের বিভিন্ন সমীকরণে ব্যবহার করতে চাইছে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গেলে আরাকান আর্মির হামলার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। সব মিলিয়ে সেখানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রত্যাবাসন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। নূরুল ইসলামও মনে করেন, রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করেছে। তাঁর মতে, সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। এর মধ্যে আরাকান আর্মি রাখাইনে শক্তিশালী হয়ে ওঠায় নতুন আরেকটি পক্ষ সামনে এসেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি—দুই পক্ষের অবস্থানই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এর আগেও একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরের বছর আগস্টে চীনের উদ্যোগে আরেক দফা প্রত্যাবাসনের চেষ্টা হয়। কিন্তু নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি হয়নি। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মিয়ানমারের কাছে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছিল। এরপর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে বহু আলোচনা, বৈঠক ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি তাঁদের নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মানতে নারাজ। ফলে তাঁরা ফিরে যাওয়ার পর নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, বসতভিটায় ফেরার সুযোগ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবেন কি না, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাখাইনে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ এবং মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন আর শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয় নেই; রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সর্বশেষ ‘বাঙালি’ মন্তব্য প্রত্যাবাসনের পথ সহজ করার বদলে নতুন করে পরিচয়, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। বাংলাদেশ যখন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন চাইছে, তখন মিয়ানমারের এমন অবস্থান সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান নির্ভর করছে মিয়ানমার তাঁদের নাগরিক অধিকার স্বীকার করে কি না, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় কি না এবং নিজেদের বাড়িঘরে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়ার বাস্তব পরিবেশ তৈরি করে কি না—তার ওপর।