ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নেই, পেন্টাগনের গোপন বার্তা ফাঁস; ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক শীর্ষ জেনারেলের সতর্কবার্তা। ইসরায়েলকে সম্ভাব্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা অস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই বলে পেন্টাগনকে সতর্ক করেছেন মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ডের (EUCOM) প্রধান জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকিউইচ। সম্প্রতি তার পাঠানো একটি গোপন বার্তা ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ জোরদার করায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা আগের তুলনায় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তায় চাপ বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এসব যুদ্ধজাহাজে অত্যাধুনিক রাডার, এজিস ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে একই সময়ে ইরানকে ঘিরে আরব সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হওয়ায় অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর চাপ বেড়েছে। জেনারেল গ্রিনকিউইচ সতর্ক করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীকে ইসরায়েলের পরিবর্তে নিজেদের ঘাঁটি ও সেনাদের নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্র ১১টি যুদ্ধজাহাজ ও দুটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ইরানি হুমকির জবাব হিসেবেই এই সামরিক অবরোধ কার্যকর করা হয়েছে। বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দিয়ে একসময় বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। অস্ত্রের মজুত কমছে এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সতর্ক করেছিলেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক অঞ্চলে সামরিক অভিযান চালানোর কারণে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হলে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে সমান্তরাল সামরিক প্রতিশ্রুতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের কড়া বার্তা এদিকে ইরানের নেতৃত্বকে "দ্বিমুখী" আখ্যা দিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো অথবা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিলেও প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করছে। তিনি লেখেন, "ইরানের নেতৃত্ব বৈঠকের জন্য নিজেরাই আগ্রহ দেখায়, আলোচনার সময়ও নির্ধারণ হয়। কিন্তু পরে প্রকাশ্যে বলে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। এটি সম্পূর্ণ দ্বিমুখী আচরণ।" হরমুজ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হরমুজ প্রণালি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—ইরানের এমন দাবিরও সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তার ভাষায়, বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ কার্যত মার্কিন নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। তিনি আরও বলেন, "আমরা না চাইলে ইরানে কিছুই প্রবেশ করতে পারবে না। একটি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত অথবা ইরান সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকবে।" ‘ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না’ ট্রাম্প পুনর্ব্যক্ত করেন, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশলের মূল লক্ষ্যই হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিশ্লেষকদের মত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন জেনারেলের সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে অস্ত্র উৎপাদন, মজুত এবং মোতায়েন কৌশল নতুন করে মূল্যায়ন করতে হতে পারে। তাদের মতে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা আরও বাড়লে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্কেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।