ছবি : রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। বৃহস্পতিবারের লেনদেন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজার নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’-এর পর এক দিনে এটিই সূচকটির সবচেয়ে বড় পতন। নাসডাক-১০০ সূচক কমেছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ডাও জোন্সের হিসাব অনুযায়ী, নাসডাক-১০০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকে এক দিনেই প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার বা আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার কমে গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদের বাকি সময়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় এআই অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণে নতুন বিধিনিষেধ আসতে পারে। নির্বাচনী প্রচারে ডেটা সেন্টারের সম্প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ এবং এআই প্রযুক্তির বিকাশের গতি পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অনেকে। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ সীমিত করার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনে দলটির সাফল্যের পর এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দরপতনের পেছনে শুধু নির্বাচনের ফল কাজ করেনি। এআই খাতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত মুনাফা কতটা আসবে, তা নিয়েও আগে থেকেই সংশয় ছিল। নির্বাচনের ফল সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। **ডেটা সেন্টার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ** এআই প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়নের জন্য বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা প্রয়োজন। এ কারণে এনভিডিয়া, মাইক্রোসফট, গুগল, মেটাসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার, উন্নত চিপ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের আর্থিক সুফল কত দ্রুত পাওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতায় পরিবেশগত প্রভাব, বিদ্যুতের চাহিদা, পানির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারেও এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া প্রভাবের সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, এসব কোম্পানির কর্মকাণ্ড পরিবেশের ক্ষতি করছে, কর্মসংস্থান কমাচ্ছে এবং মানবজাতির ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এ কারণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার দাবি জানান। টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসাও নির্বাচনী প্রচারে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণের অনুমোদন পেতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বাড়তি পরিবেশগত পর্যালোচনা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে। ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান স্যাক্সোর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বিবিসিকে বলেন, ডেটা সেন্টারের অনুমোদন, পরিবেশের ওপর প্রভাব এবং বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বাড়তি যাচাই-বাছাই প্রকল্পগুলো বিলম্বিত করতে পারে। একই সঙ্গে পুরো শিল্পের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইউবিএসের বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সেন্টারের যে সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, তার প্রায় ৩০ শতাংশ নির্মাণকাজ স্থগিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। **চিপ নির্মাতাদের শেয়ারে বড় পতন** এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চিপ ও যন্ত্রপাতি তৈরি করে এমন কোম্পানিগুলোর শেয়ারে সবচেয়ে বড় দরপতন দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এনভিডিয়ার শেয়ারদর কমেছে ৯ শতাংশের বেশি। অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের (এএমডি) শেয়ার কমেছে ১৭ শতাংশের বেশি। মাইক্রনের দরও ১৭ শতাংশের বেশি কমেছে। মেমোরি চিপ নির্মাতা স্যানডিস্কের শেয়ারদর কমেছে ২২ শতাংশের বেশি। সেমিকন্ডাক্টর খাতের ৩০টি বড় কোম্পানির শেয়ারের দর পর্যবেক্ষণ করা ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ। এআই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও বড় পতন হয়েছে। কোরউইভের শেয়ারদর কমেছে ১০ শতাংশ এবং নেবিয়াসের কমেছে ১৫ শতাংশ। টেসলার শেয়ারদরও প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। বৃহস্পতিবারের লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের সাতটি শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির—অ্যাপল, এনভিডিয়া ও টেসলাসহ—সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় এক লাখ কোটি ডলার কমেছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। **নাসডাক এখন সংশোধনের পর্যায়ে** বৃহস্পতিবারের দরপতনের পর নাসডাক কম্পোজিট সূচক ৬ অক্টোবরের রেকর্ড অবস্থান থেকে প্রায় ১২ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে। শেয়ারবাজারের পরিভাষায়, কোনো সূচক বা শেয়ারের দাম সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ১০ শতাংশ বা তার বেশি কমলে তাকে ‘কারেকশন’ বা সংশোধনের পর্যায় বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান সূচকেও বড় পতন হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কমেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসান্নাহ স্ট্রিটার বলেন, এআই খাত নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া আতঙ্ক ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এআই অবকাঠামোয় বিপুল অর্থ বিনিয়োগের পর যে মুনাফার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। এর সঙ্গে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বড় ধরনের ধীরগতির আশঙ্কা যুক্ত হয়েছে। **এশিয়ার প্রযুক্তি শেয়ারেও ধস** যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতনের প্রভাব পড়ে এশিয়াতেও। শুক্রবার লেনদেনের শুরুতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে বড় পতন দেখা যায়। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দিনের শুরুর দিকে ৬ শতাংশ কমে যায়। দেশটির মেমোরি চিপ নির্মাতা কিওক্সিয়ার শেয়ারদর কমে ১২ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি। টোকিও ইলেকট্রনের দর কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ার চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। স্যামসাংয়ের দর কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। এর প্রভাবে দেশটির কসপি সূচক ৮ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। দরপতনের গতি সামাল দিতে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে ‘সার্কিট ব্রেকার’ কার্যকর করা হয়। তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক কমেছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। দেশটির বৃহৎ চিপ নির্মাতা টিএসএমসির শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় এবং এর বিপরীতে মুনাফা পাওয়ার অনিশ্চয়তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল সেই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। মার্কেটওয়াচের চিপ বিশ্লেষক ব্রিটনি নগুয়েন বিবিসিকে বলেন, সাম্প্রতিক দরপতনে এআই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ নিয়ে বাজারের উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটেছে। **এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন** শেয়ারবাজারের এই পতন এআই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাকেও সামনে এনেছে। একদিকে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল অর্থ ঢালছে, অন্যদিকে এসব বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেটা সেন্টার নির্মাণে পরিবেশগত ও রাজনৈতিক বাধার আশঙ্কা। এআই খাতের নেতারাও ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরোধিতাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান বলেন, ডেটা সেন্টার নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া সবাইকে বিস্মিত করেছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এসব প্রকল্পের পক্ষে আনতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আরও কাজ করতে হবে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রযুক্তিবিষয়ক এক সম্মেলনে বুধবার তিনি বলেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে কোনো প্রকল্পকে স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করা সম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও আলোচনা প্রয়োজন। মেটার প্রেসিডেন্ট দিনা পাওয়েল ম্যাককরমিকও এআইকে ইতিবাচক প্রযুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে কোম্পানিগুলোকে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে নির্বাচনের ফলাফলের পর শেয়ারবাজারের পতন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বাজারের পতনের সঙ্গে নির্বাচনের ফলাফলের সম্পর্ক তুলে ধরে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ মেয়াদে এআই বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই প্রযুক্তি ঘিরে বিনিয়োগের প্রবল আগ্রহ, অবকাঠামো নির্মাণের বিপুল ব্যয় এবং কোম্পানিগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য কতটা বাস্তবসম্মত—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।