প্রকাশ :: ... | ... | ...

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের লড়াই বদলে দিচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একের পর এক রায় ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে নির্বাচনী রাজনীতিতে। নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটাধিকার এবং প্রচারে অর্থব্যয়ের বিধিনিষেধ নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তগুলো কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলছে। নির্বাচনী মামলায় আদালতের এমন সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের উদারপন্থি বিচারপতি এলেনা কাগান। সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় রিপাবলিকানরা তুলনামূলক সুবিধা পেয়েছেন বলে মনে করছেন আইন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং নির্বাচনী প্রচারে অর্থব্যয়ের বিধিনিষেধ শিথিল করার সিদ্ধান্ত দলটির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব আইনি সাফল্য শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলকে কতটা সহায়তা করবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অল্প ব্যবধানে। উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিটি কক্ষে নিট চারটি করে আসন বাড়াতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই কক্ষের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে কংগ্রেসে তদন্তের সুযোগও বাড়তে পারে। গত বছর ও চলতি বছরে সুপ্রিম কোর্টের কয়েকটি সিদ্ধান্ত প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী আসনের মানচিত্র রিপাবলিকানদের জন্য তুলনামূলক অনুকূল করার পথ খুলে দিয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনও লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে আদালতের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক প্রভাব থাকলেও তা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভোটাধিকার ও প্রচারে অর্থব্যয় নিয়ে বিতর্ক সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে রক্ষণশীল বিচারপতিরা ৬-৩ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাঁদের সমর্থনে দেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায় রিপাবলিকানদের নির্বাচনী কৌশলে প্রভাব ফেলেছে। এপ্রিলে আদালত ১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের প্রয়োগ সীমিত করে দেন। আইনটি মূলত জাতিগত বৈষম্য থেকে ভোটারদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছিল। এরপর জুনে নির্বাচনী প্রচারে অর্থব্যয়ের ওপর দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা একটি সীমাবদ্ধতা বাতিল করেন আদালত। তবে আদালতের সব সিদ্ধান্তই রিপাবলিকানদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। গত মাসে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত করার ট্রাম্প-সমর্থিত একটি উদ্যোগ নাকচ করে দেন বিচারপতিরা। ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলে মনে করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ভিন্নমত জানান আদালতের দুই রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিটো। ভার্জিনিয়ার জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়া সোমিনের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী মামলাগুলোর সামগ্রিক প্রভাবে রিপাবলিকানরা সুবিধা পেয়েছেন। তাঁর বিশ্লেষণে, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল বিচারিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন ঘটেছে। নির্বাচন ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে মামলার সংখ্যাও তাঁর নজরে এসেছে। সোমিনের মতে, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আদালতে নির্বাচনী বিরোধসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনী আসনের সীমানা নিয়ে প্রতিযোগিতা নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ তুলে নির্বাচনী মানচিত্রের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ জানানো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্রুত প্রতিনিধি পরিষদের আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব আসনের কয়েকটিতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের বড় একটি অংশ সাধারণত ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেন। সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত অঙ্গরাজ্যগুলোকে নির্বাচনী আসনের সীমানা নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ দিয়েছে। এর ফলে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নির্বাচনী মানচিত্র নিয়ে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। দলীয় স্বার্থে আসনের সীমানা নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘জেরিম্যান্ডারিং’ বলা হয়। এর মাধ্যমে কোনো দলের ভোটের অনুপাতের তুলনায় বেশি আসন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। গত বছর ট্রাম্প রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিদ্যমান কংগ্রেসীয় আসনের সীমানা নতুন করে নির্ধারণের আহ্বান জানান। তাঁর লক্ষ্য ছিল, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসনসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। টেক্সাস প্রথমে এ উদ্যোগ নেয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যটির নতুন নির্বাচনী মানচিত্র কার্যকর রাখার অনুমতি দেন। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত প্রতি দশকের শুরুতে জনসংখ্যার পরিবর্তন বিবেচনায় নিয়ে অঙ্গরাজ্যগুলো কংগ্রেসীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে মার্কিন আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করা হয়। তবে এবার কয়েকটি অঙ্গরাজ্য দশক শেষ হওয়ার আগেই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। ফলে নির্বাচনের আগে আসনের সীমানা পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের উদারপন্থি বিচারপতি এলেনা কাগান ২০১৯ সালের একটি রায় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচনী আসনের সীমানা নির্ধারণে আদালতের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনি প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ। নির্বাচনী বিরোধে আদালতের সিদ্ধান্ত কীভাবে ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে। আদালতের রায়, ভোটাধিকার ও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ এবারের নির্বাচন দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু প্রার্থী, প্রচার ও ভোটারদের পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আদালতের রায়, নির্বাচনী এলাকার সীমানা এবং প্রচারে অর্থব্যয়ের নিয়মও রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে কোনো রায় একটি দলকে নির্বাচনী সুবিধা দিলেও ভোটারদের মনোভাব, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ইস্যু এবং নির্বাচনী প্রচারের কার্যকারিতাও ফলাফলে ভূমিকা রাখবে। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে এসব বিষয় কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তার ওপর। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু নির্বাচনের আগেই আদালতের একের পর এক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিয়ম, ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।