প্রকাশ :: ... | ... | ...

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান ইরানের


সংযুক্ত ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং মতপার্থক্য নিরসনের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে তেহরানে বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইরানের রাজধানী তেহরানে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির তিন সদস্যদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন অংশ নেন। ইরানের পক্ষে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজাই উপস্থিত ছিলেন। আল জাজিরা, রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। বৈঠকে পেজেশকিয়ান মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা গভীর করা, মতপার্থক্য দূর করা এবং মুসলিম দেশগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়ে তেহরানের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান এমন যেকোনো সমঝোতা ও উদ্যোগকে সমর্থন করবে, যা আঞ্চলিক ঐক্য, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন জোরদার করে। পেজেশকিয়ান গাজা, লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য স্থানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি মোকাবিলায় তাদের একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে। তবে এসব বিষয়ে তেহরানের বক্তব্য ইরানের নিজস্ব অবস্থান; যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাদের সামরিক নীতি ও পদক্ষেপের ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। সংঘাতের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগ তেহরানের বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক মাসে সামরিক সংঘাত, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং কূটনৈতিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের হামলা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার কাঠামো গড়ে উঠেছে। চুক্তির মূল ধারণা হলো, সদস্যদেশগুলোর কোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। এই তিন দেশের প্রতিনিধিদের ইরান সফর তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে ইরানের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং উত্তেজনা প্রশমনের পথ খোঁজার চেষ্টা চলছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের এই সফরকে কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বৈঠক থেকেই বড় কোনো সমঝোতা বা সংঘাত অবসানের চুক্তি হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বৈঠক শেষে চার দেশের প্রতিনিধিরা আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন। পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের অবস্থান বৈঠকে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিরও সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তাঁর বক্তব্য, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। তবে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তেহরানের রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে ‘পরস্পরবিরোধী’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন একদিকে আলোচনায় বসার কথা বলেছে, অন্যদিকে ইরান ও দেশটির পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এই অভিযোগের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ চলছে। তেহরান বলে আসছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই বিরোধের সঙ্গে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সামরিক উত্তেজনার বিষয়গুলোও জড়িয়ে রয়েছে। আলোচনার সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তেহরানের বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধের মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ, পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানে বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যস্থতা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনায় কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর। আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং সংঘাত এড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু বৈঠক বা যৌথ বিবৃতি দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা কঠিন। সামরিক উত্তেজনা কমানো, পরস্পরের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া এবং আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তেহরানের বৈঠক থেকে আপাতত যে বার্তা পাওয়া যাচ্ছে, তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যের সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে চায়। তবে এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সংঘাত প্রশমনে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।