ভারতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) ঘিরে প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে চলমান আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রধান দাবি থেকে সরে আসেনি ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়ে সংগঠনটি সরকারকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। সিজেপির দাবি, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা বা বিকল্প প্রস্তাব তারা মেনে নেবে না। একই সঙ্গে আন্দোলন চলাকালে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা ও এফআইআর প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। সরকারের সঙ্গে বৈঠক শুক্রবার নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সরকারের পক্ষে অংশ নেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। অন্যদিকে সিজেপির পক্ষে বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন সংগঠনটির জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাসসহ আরও একজন তরুণ প্রতিনিধি। বৈঠক শেষে সৌরভ দাস সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে কোনো আপস হবে না। এটি আমাদের প্রধান দাবি এবং এ বিষয়ে আমরা কোনো বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করব না।” তিনি আরও জানান, আন্দোলনের সময় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও সরকারের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বৈঠকে অংশ নেওয়া সিজেপির এক প্রতিনিধি জানান, শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওই প্রতিনিধি বলেন, “সরকার কিছু বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া আমরা কোনো সমাধান মেনে নেব না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে।” অর্থাৎ, সরকার আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের প্রধান দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিলে আন্দোলন আরও জোরালো করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সিজেপি। শনিবার আবার বৈঠক এদিকে বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা জানান, সরকার ও সিজেপির মধ্যে আলোচনা এখানেই শেষ হচ্ছে না। শনিবার উভয় পক্ষের মধ্যে আবারও আলোচনা হবে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি সিজেপি ও সরকারের মধ্যে তৃতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক। তবে ধারাবাহিক বৈঠক হলেও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। সরকারের পদক্ষেপে সন্তুষ্ট নয় সিজেপি নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কারণে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছেন। এ জন্য নতুন আইন প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে। তবে সিজেপির বক্তব্য, শুধু আইন প্রণয়ন বা অভিযুক্তদের শাস্তি দেওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, পরীক্ষার অনিয়মের নৈতিক ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকেই পদত্যাগ করতে হবে। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, শিক্ষার্থীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ হওয়া উচিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ গত ২০ জুলাই দিল্লিতে সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের সময় নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের ওপর র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা আরএএফ পেলেট গান ব্যবহার করেছে। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো তারা যাচাই করে দেখছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এ ধরনের বলপ্রয়োগের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সোনম ওয়াংচুকের অনশন শেষ নিট পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই শিক্ষাবিদ ও জলবায়ু অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি ২৬ দিনের অনশন শেষ করেছেন। তবে সিজেপি জানিয়েছে, সোনম ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করলেও তাদের আন্দোলন থামছে না। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, তাদের মূল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সামনে কী হতে পারে? এখন মূল নজর ২৪ ঘণ্টার সময়সীমার দিকে। সরকার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মেনে নেয় কি না, নাকি আলোচনার মাধ্যমে অন্য কোনো সমাধানের পথ খোঁজে—তা নিয়েই অপেক্ষা করছেন আন্দোলনকারীরা। শনিবার সরকার ও সিজেপির মধ্যে আবারও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে ওই বৈঠকেই পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে। তবে সিজেপি যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড়, তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে। ফলে সরকার যদি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সরকার যদি কোনো সমঝোতার উদ্যোগ নেয়, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথও তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন শুধু পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় নেওয়ার দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, নিহত ও আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে এটি একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।