ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং এতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা পেতে পারে—এমন অভিযোগ তুলে দেশটির বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন করছেন বিরোধী দল, শিক্ষার্থী ও তরুণেরা। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবিগুলোর একটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। দিল্লিতে বিক্ষোভের আগে আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দীপককে আটক করা, পরে ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকে মুক্তি দেওয়া এবং চেন্নাইয়ে বিরোধী জোটের কর্মসূচিতে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল টিভিকের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে বিতর্কটি এখন জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন—এ অভিযোগই আন্দোলনের মূল ভিত্তি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যাচাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটার-এন্ট্রি বাদ পড়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত, ৩ কোটি শনাক্ত করা যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে কমিশনের বক্তব্য, এগুলো যাচাইয়ের সময় চিহ্নিত এন্ট্রি; খসড়া তালিকা থেকে ভুলভাবে বাদ পড়া যোগ্য ভোটারেরা পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন লেখক সালমান রুশদিও। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি ভারতের পরিস্থিতিকে ‘ফুটন্ত’ বলে বর্ণনা করে তরুণদের আন্দোলনকে দীর্ঘদিন পর আশার আলো হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বিজেপির নেতারা আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করছেন। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রশ্ন—ভোটার তালিকা সংশোধন কতটা স্বচ্ছ এবং সরকারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও ক্ষমতা পরিবর্তনের দাবি তোলার অধিকার কতটা সুরক্ষিত। দিল্লিতে শুক্রবার ‘লেহরা দো তেরঙ্গা’ মার্চ কর্মসূচির আগে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপককে আটক করে পুলিশ। কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। পুলিশ তাঁকে কর্মসূচি বন্ধ করতে নোটিশ দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দীপকের আটকের পর সিজেপি অভিযোগ করে, তাঁকে কোথায় রাখা হয়েছে এবং কেন আটক করা হয়েছে, তা দলকে জানানো হয়নি। তাঁকে আইনজীবী ও দলের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১২৬ ও ১৭০ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে; তাঁকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার কথা ছিল। একই দিনে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করা হয়। পরে দিল্লি পুলিশ জানায়, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সিজেপির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আগের একটি বিক্ষোভের ঘটনায় পাঁচ দিনের হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল বলে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে। তাঁদের আটকের প্রতিবাদেই দীপক নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন। দিল্লিতে আন্দোলন ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো, ব্যারিকেড বসানো এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণের খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। এর আগেও আন্দোলনকারীদের জমায়েত ছত্রভঙ্গ ও বহু মানুষকে আটক করার ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারীরা একে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা ও আইনশৃঙ্খলার বিধিনিষেধ অমান্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চেন্নাইয়ে বিজয়ের দলও বিরোধী বিক্ষোভে দিল্লির পাশাপাশি চেন্নাইয়েও এসআইআরবিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করে। এতে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) অংশ নেয়। বিরোধী জোটে যোগ দেওয়ার পর এ ধরনের কর্মসূচিতে দলটির অংশগ্রহণকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁরা নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি ও ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তবে তামিলনাড়ুতে ৯৭ লাখ নাম বাদ পড়ার যে সংখ্যা আলোচনায় এসেছে, সেটিকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সমার্থক হিসেবে দেখার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও বাদ পড়ার শ্রেণিবিন্যাস যাচাই করা প্রয়োজন। এর কয়েক দিন আগে, ১০ অক্টোবর, চেন্নাইয়ের নীলাঙ্করাইয়ে টিভিকে প্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ওই বৈঠকের পর কংগ্রেসের বিক্ষোভে টিভিকের অংশগ্রহণ ইন্ডিয়া জোটের রাজনৈতিক সমন্বয় আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে এ ঘটনাকে জোটের ভবিষ্যৎ কৌশলের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখার আগে দলগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও পরবর্তী কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। আন্দোলনের পাশে বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদি ভারতের তরুণদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আলোচনায় এসেছেন বিতর্কিত লেখক সালমান রুশদি। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে এশিয়ান আমেরিকান রাইটার্স ওয়ার্কশপের তহবিল সংগ্রহের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত ফুটছে।’ ককরোচ আন্দোলনকে ‘উদ্যাপন’ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের তরুণেরা দীর্ঘদিন পর আশার আলো জাগিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের বিবরণ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও লাইভমিন্ট প্রকাশ করেছে। একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ার নিজেকে ‘ককরোচদের মা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারতে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা তরুণদের নিয়ে তিনি গর্বিত। রুশদি তাঁর শৈশবের বোম্বের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, তখন হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান ও পার্সি সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের উৎসবে অংশ নিতেন। বর্তমান ভারতে সেই সামাজিক সম্প্রীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তাঁর বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ পায়। রুশদির মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরেও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিসরে আলোচনায় এসেছে। তবে কোনো বিশিষ্ট লেখক বা শিল্পীর সমর্থন আন্দোলনকারীদের অভিযোগের সত্যতা নিজে থেকে প্রমাণ করে না। ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে তথ্য, নথি, আইন ও যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে। সরকার পরিবর্তনের দাবি কি অসাংবিধানিক এসআইআরবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে আরেকটি বড় বিতর্ক হলো—নির্বাচিত সরকারের পদত্যাগ বা সরকার পরিবর্তনের দাবি তোলা কি গণতন্ত্রবিরোধী? আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ আন্দোলনের সমর্থকেরা বলছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, সরকারের সমালোচনা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলকে পরাজিত করার প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। বিজেপির কয়েকজন নেতা আন্দোলনকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে; কেবল সরকার পরিবর্তনের দাবি থেকেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ভারতের সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠন গঠনের অধিকার স্বীকৃত—যদিও আইন অনুযায়ী এসব অধিকারে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ থাকতে পারে। আবার সংবিধানের ৭৫(৩) অনুচ্ছেদে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাকে লোকসভার কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার সংসদীয় আস্থার ভিত্তিতে ক্ষমতায় থাকে। নির্বাচনে জয়ী হওয়া সরকারকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখে না; একই সঙ্গে প্রতিবাদের অধিকারও আইন ভঙ্গের অবাধ অনুমতি দেয় না। বিজেপির সমালোচকেরা দলটির অতীতের সরকারবিরোধী আন্দোলন এবং নরেন্দ্র মোদির ‘কংগ্রেসমুক্ত ভারত’ প্রচারের কথা তুলে ধরে বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাঁদের যুক্তি, একসময় যে রাজনৈতিক দল সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছে, তার পক্ষে একই ধরনের দাবিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রবিরোধী বলা অসংগত। তবে অতীতের বক্তব্য ও বর্তমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এক নয়; সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ও ঘটনার প্রেক্ষাপট যাচাই করে তুলনা করা উচিত। এই বিতর্কে ‘সরকার’ ও ‘রাষ্ট্র’কে এক করে দেখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকার পরিবর্তনের দাবি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে; কিন্তু সহিংসতা, ভাঙচুর বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলে সেগুলো পৃথকভাবে তদন্তযোগ্য। একইভাবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত, রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়। রামধারী সিং দিনকরের বহুল উদ্ধৃত পঙ্ক্তি—‘সিংহাসন খালি করো, জনগণ আসছে’—এই বিতর্কে আবার সামনে এসেছে। এর রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, গণতন্ত্রে ক্ষমতার চূড়ান্ত বৈধতা জনগণের কাছ থেকে আসে। কিন্তু সেই বৈধতা রক্ষা করতে হলে নির্বাচন যেমন স্বচ্ছ হতে হবে, তেমনি নাগরিকদের অভিযোগ শোনা, ভোটার তালিকার ভুল সংশোধন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের বর্তমান বিতর্কের পরিণতি নির্ভর করবে অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত, নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি এবং সরকার ও বিরোধী পক্ষের রাজনৈতিক আচরণের ওপর। ভোটার তালিকা সংশোধনে প্রকৃত ভুল হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তথ্য দিয়ে তা খণ্ডন করা—দুই ক্ষেত্রেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতবিরোধের সমাধান হওয়া উচিত তথ্য, আইন ও জনআস্থার ভিত্তিতে; শুধু আটক, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়।