প্রকাশ :: ... | ... | ...

‘সিন্ধু জলচুক্তি মানতে হবে’, হেগের রায় খারিজ দিল্লির, ‘অবৈধ’ আদালতের নির্দেশে পাত্তা নেই ভারতের


সংযুক্ত ছবি

পাকিস্তানের সঙ্গে ছয় দশকের বেশি পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি মেনে চলতে হবে ভারতকে। একতরফাভাবে চুক্তি স্থগিত রাখার কোনো বৈধ ভিত্তি নেই বলে রায় দিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের হেগে গঠিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত। একই সঙ্গে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্দিষ্ট কিছু নির্মাণকাজের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার, ৩১ আগস্ট এই সিদ্ধান্ত দেন সিন্ধু পানি চুক্তির অধীনে গঠিত কোর্ট অব আরবিট্রেশন। পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশন (পিসিএ) এই মামলায় সচিবালয় হিসেবে কাজ করছে। আদালত সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বলেছেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো ‘সম্পূর্ণভাবে কার্যকর’ রয়েছে। ফলে চুক্তির অধীনে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ ও পরিচালনাসহ ভারতের ওপর যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মেনে চলতে হবে। ভারত অবশ্য এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে। নয়াদিল্লির দাবি, সালিসি আদালতটি বৈধভাবে গঠিত হয়নি এবং ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর এর কোনো এখতিয়ার নেই। একই সঙ্গে ভারত জানিয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছিল, সেটি বহাল থাকবে। অন্যদিকে রায়কে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ বলছে, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত বা বাতিল করা যায় না—তাদের দীর্ঘদিনের এই অবস্থানই আদালতের সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেন চুক্তি স্থগিত করেছিল ভারত ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ তোলে ভারত। এরপর ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি ‘স্থগিত’ রাখার ঘোষণা দেয় নয়াদিল্লি। পাকিস্তান শুরু থেকেই ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ভারতের ওই সিদ্ধান্তের পর দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে পানি নিয়ে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় সিন্ধু নদব্যবস্থার পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ইসলামাবাদ বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখে। হেগের সালিসি আদালত ভারতের চুক্তি স্থগিতের সম্ভাব্য আইনি ভিত্তিগুলো পর্যালোচনা করে। সন্ত্রাসবাদ, পরিস্থিতির পরিবর্তন কিংবা সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে একটি পক্ষ একতরফাভাবে এই চুক্তি স্থগিত করতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। আদালত সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এসব কোনো কারণই সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার বৈধ ভিত্তি তৈরি করে না। রাতলে প্রকল্পে বিধিনিষেধ আদালতের সিদ্ধান্তের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের চেনাব নদীর ওপর নির্মাণাধীন রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, এসব প্রকল্প এমনভাবে নির্মাণ করা হলে ভারত নদীর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বাড়তি সক্ষমতা পেতে পারে, যা সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। ৩১ আগস্টের অন্তর্বর্তী আদেশে সালিসি আদালত ভারতকে রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের দেয়াল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানি প্রবেশের কাঠামো নির্দিষ্ট উচ্চতার ওপরে কংক্রিট না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিধিনিষেধ বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর আরও ৯০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকবে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের জুলাইয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে রাতলে প্রকল্পের নির্মাণকাজ কত দূর এগোচ্ছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তথ্য দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কিশানগঙ্গা ও রাতলে—দুই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা নিয়ে পৃথকভাবে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের কার্যক্রমও চলছে। তবে হেগের আদালতের সর্বশেষ অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞাটি বিশেষভাবে রাতলে প্রকল্পের নির্দিষ্ট নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে। কী আছে সিন্ধু পানি চুক্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিতে সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি প্রধান নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু—এই তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় নদীর পানির প্রধান ব্যবহারাধিকার দেওয়া হয় ভারতকে। অন্যদিকে সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব—এই তিনটি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীর পানির প্রধান ব্যবহারাধিকার পায় পাকিস্তান। তবে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো ভারতের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নির্দিষ্ট শর্তে ভারত সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনসহ কিছু কাজে পানি ব্যবহার করতে পারে। এসব প্রকল্পের নকশা ও পরিচালনা কীভাবে হবে, চুক্তিতে তারও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমান বিরোধের বড় অংশই ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর নকশা ওই শর্ত মেনে চলছে কি না, তা নিয়ে। ছয় দশকের বেশি টিকে থাকা চুক্তি ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক স্বাধীনতার পর থেকেই বৈরী। কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশ একাধিক যুদ্ধে জড়িয়েছে, সীমান্তে বহুবার সংঘর্ষ হয়েছে এবং কূটনৈতিক সম্পর্কও নানা সময়ে তলানিতে নেমেছে। তার পরও সিন্ধু পানি চুক্তি ছয় দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর ছিল। দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে টেকসই দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাগুলোর একটি হিসেবে এটিকে দেখা হয়। এই চুক্তি পাকিস্তানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিস্তীর্ণ কৃষিজমির সেচব্যবস্থা সিন্ধু নদ ও এর উপনদীগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে উজানের পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন পাকিস্তানের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তানের স্বাগত পাকিস্তান হেগের সিদ্ধান্তকে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেছেন, সিদ্ধান্তটি পাকিস্তানের ধারাবাহিক অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি কোনো পক্ষ একতরফাভাবে স্থগিত বা বাতিল করতে পারে না। চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের অধিকার রক্ষায় ইসলামাবাদ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। পাকিস্তান সরকার রাতলে প্রকল্পে আদালতের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাকেও স্বাগত জানিয়েছে। রায় মানছে না ভারত ভারতের অবস্থান ঠিক বিপরীত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে সালিসি আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘তথাকথিত রায়’ হিসেবে অভিহিত করে তা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের দাবি, এই কোর্ট অব আরবিট্রেশন অবৈধভাবে গঠিত এবং ভারতের ওপর সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো বৈধ এখতিয়ার এর নেই। ভারত আরও জানিয়েছে, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। ফলে হেগের সিদ্ধান্তের পরও দুই দেশের মধ্যে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিরোধ এখনই শেষ হচ্ছে না। নয়াদিল্লি এর আগেও এই সালিসি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। সামনে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত সিন্ধু পানি বিরোধ মীমাংসার জন্য চুক্তির মধ্যেই কয়েক স্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনা থেকে শুরু করে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজন হলে কোর্ট অব আরবিট্রেশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান আছে। বর্তমান বিরোধে আবার একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ভারত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিচ্ছে, আর পাকিস্তান সালিসি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংক-নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ কিশানগঙ্গা ও রাতলে প্রকল্পের নকশা সিন্ধু পানি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পরীক্ষা করছেন। তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের জুলাইয়ে আসার কথা। সেই সিদ্ধান্তের আগে রাতলে প্রকল্পে এমন নির্মাণ না করতে ভারতকে বলা হয়েছে, যা পরে পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। হেগের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত তাই শুধু পানি বণ্টনের বিরোধ নয়; আন্তর্জাতিক চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার ক্ষমতা নিয়েও ভারত-পাকিস্তানের আইনি লড়াইকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেল। আদালত বলছে, চুক্তি বহাল এবং ভারত এর বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য। ভারত বলছে, আদালতেরই বৈধতা নেই এবং তাদের স্থগিতের সিদ্ধান্ত বহাল। ফলে ছয় দশকের বেশি পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও কিছুদিন চলবে বলেই মনে হচ্ছে।