ভারতের গ্রামীণ ও জরাজীর্ণ সরকারি স্কুলগুলোর অবকাঠামো সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু করেছে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভারতের স্বাধীনতা দিবস থেকে ‘স্কুল ঠিক করো’ বা ‘ফিক্স দ্য স্কুল’ নামে এই কর্মসূচি শুরু করেছে সংগঠনটি। দিল্লির উপকণ্ঠে হরিয়ানার ফরিদাবাদ জেলার খেড়ি কালান গ্রামে গিয়ে সরকারি একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবস্থা তুলে ধরেছেন সিজেপির কর্মীরা। বাইরে থেকে নতুন রঙ করা ভবনটি পরিচ্ছন্ন মনে হলেও ভেতরের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ছাদ থেকে খসে পড়ছে প্লাস্টার, আটটি শৌচাগারের চারটি ব্যবহারের অনুপযোগী এবং নয়টি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে চারটি শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হওয়ায় পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় সামাজিক কর্মী সতপাল নরওয়াত বলেন, বর্ষার সময় শ্রেণিকক্ষগুলো পানিতে ডুবে যায়। তখন শিক্ষার্থীদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও থাকে না। ভারতের গ্রামীণ এলাকায় এমন চিত্র বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নজরদারির অভাবে দেশটির অনেক সরকারি স্কুল বছরের পর বছর জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিকে সামনে এনে আন্দোলনে নেমেছে ককরোচ জনতা পার্টি। এর আগে ভারতের মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে সংগঠনটির দীর্ঘ বিক্ষোভ আলোচনায় এসেছিল। এবার সরকারি স্কুলের অবকাঠামো নিয়ে দেশজুড়ে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে তারা। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, গ্রামীণ ভারতের সরকারি স্কুলগুলো কয়েক দশক ধরে অবহেলার শিকার। শহরের শিশুদের তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থীরা সুযোগ-সুবিধা কম পাওয়ায় শিক্ষাজীবন শেষে তাদের অনেকেই কৃষিকাজ, দিনমজুরি কিংবা নির্মাণশ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। দীপকে জানান, তিনি দেশের ২০টির বেশি গ্রামীণ স্কুল পরিদর্শন করেছেন। তাঁর দাবি, একটি স্কুলকেও তিনি সন্তোষজনক পরিবেশে পাননি। কোথাও বেঞ্চ নেই, কোথাও ব্যবহারযোগ্য বাথরুম বা নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নেই। সিজেপির নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব স্কুলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করছেন। ফুটো ছাদ, নোংরা শৌচাগার, ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষ এবং মেঝেতে বসে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ছে। সংগঠনটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ বলে জানানো হয়েছে। দীপকে বলেন, তাঁদের লক্ষ্য খুব বড় কিছু নয়। অন্তত শিক্ষার্থীদের বসার বেঞ্চ, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক শ্রেণিকক্ষের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় নিজেদের পিছিয়ে মনে না করে। সিজেপির কর্মসূচির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মোবাইল ফোনে স্কুলের দুরবস্থার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করছে। এসব ভিডিও প্রকাশের পর কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনও ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। মহারাষ্ট্রের রায়গড়ে কয়েকজন ছাত্রী স্কুলে যাওয়ার রাস্তার বেহাল অবস্থা নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করলে দ্রুত রাস্তা মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশে শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে রাস্তা নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। একটি ভিডিওতে এক ছাত্রীকে জেলা কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করতে দেখা যায়, তিনি নিজের সন্তানকে এমন জরাজীর্ণ স্কুলে পড়াবেন কি না। সাংবাদিক ও লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের মতে, যন্তর মন্তরের আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা বা একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর মাধ্যমে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তাঁর মতে, ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রাখে। তবে ককরোচ জনতা পার্টির এই কর্মসূচি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার কিংবা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। শিক্ষায় ভারতের সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। দেশটি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করে। ভারতের জাতীয় শিক্ষা নীতি এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই বরাদ্দ বাড়িয়ে অন্তত ৬ শতাংশ করার সুপারিশ করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে ভারতে প্রায় ৯৪ হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। নীতি আয়োগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে স্কুল একীভূত করা হলেও সরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে অবকাঠামোর দুর্বলতাও অন্যতম কারণ। এর ফলে অনেক পরিবার বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকছে। অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষক সংকটও ভারতের সরকারি স্কুলগুলোর বড় সমস্যা। ফরিদাবাদের আত্মাদপুর গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চতর সিং জানান, তাঁদের স্কুলে ৯১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ জন শিক্ষক বরাদ্দ থাকলেও ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে ৩০ জন শিক্ষককে পাঠানো হয়েছে। চারজন শিক্ষক অসুস্থ থাকায় একসময় মাত্র ছয়জন শিক্ষককে ৯১০ জন শিক্ষার্থী সামলাতে হয়েছে। চতর সিংয়ের অভিযোগ, শিক্ষকদের পড়ানোর পাশাপাশি আদমশুমারি ও নির্বাচনের মতো সরকারি কাজে নিয়োজিত করা হয়। এতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকারি স্কুলে সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টিও সামনে এনেছেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারি স্কুলে মূলত শ্রমিক ও সমাজের পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। অনেক আমলা ও রাজনীতিক নিজেদের সন্তানকে বেসরকারি স্কুলে পড়ান। ফলে সরকারি স্কুলের সমস্যাগুলো নিয়ে তাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা তৈরি হয় না। খেড়ি কালানের বাসিন্দা সতপাল নরওয়াতের বয়স এখন ৬২ বছর। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত তিনিও এই বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর স্মৃতিতে তখন স্কুলটি ছিল গ্রামের একমাত্র যৌথ বিদ্যালয়। প্রায় ১৫ বছর আগে স্কুলের বাইরের রাস্তা উঁচু করার পর স্কুল প্রাঙ্গণ নিচু হয়ে যায়। এরপর থেকে বৃষ্টির পানি জমে থাকার সমস্যা তৈরি হয়েছে। বছরের পর বছর স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে আবেদন করেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে জানান নরওয়াত। তবে ককরোচ জনতা পার্টির ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি তাঁকে নতুন করে আশাবাদী করেছে। তাঁর আশা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ যদি নিজেদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করে, তাহলে দীর্ঘদিনের অবহেলায় থাকা সরকারি স্কুলগুলোর অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে।