প্রকাশ :: ... | ... | ...

সারা জীবন মুসলিম ছিলাম, অথচ জানতামই না!


সংযুক্ত ছবি

কোরআন পাঠে নিজের বিশ্বাসের মিল খুঁজে পান মার্কিন তরুণী অ্যাঞ্জেলা ইসলামের পথে আসার গল্প সবার এক রকম নয়। কারও জীবনে ধর্মীয় অনুসন্ধান শুরু হয় কোনো বিশেষ ঘটনা থেকে, কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চিন্তা ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের তরুণী অ্যাঞ্জেলার জীবনেও ইসলাম গ্রহণের যাত্রা ছিল এমনই এক আত্মঅনুসন্ধানের গল্প। আদিবাসী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা অ্যাঞ্জেলা শৈশব থেকেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও প্রার্থনার চর্চা দেখে বড় হয়েছেন। পরে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানতে গিয়ে ইসলামের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও জীবনাচরণের মিল খুঁজে পান তিনি। তাঁর উপলব্ধি, ‘সারা জীবন মুসলিম ছিলাম, অথচ জানতামই না!’ ‘অ্যাবাউট ইসলাম’কে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন অ্যাঞ্জেলা। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদিবাসী সংরক্ষিত এলাকায় তাঁর বেড়ে ওঠা। পরিবার ও সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন অত্যন্ত আধ্যাত্মিক। তাঁর দাদা-দাদি সব সময় সৃষ্টিকর্তার কথা বলতেন, শোনাতেন নানা গল্প। ছোটবেলা থেকেই সেসব গল্প ও শিক্ষা তাঁর চিন্তাজগতে প্রভাব ফেলেছিল। অ্যাঞ্জেলার বয়স যখন ১০ বছর, তখন তাঁকে অন্য আদিবাসী শিশুদের সঙ্গে একটি ক্যাথলিক আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। তাঁর ধারণা, কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের আরও বেশি আমেরিকান সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা। সেখানে দুই বছর কাটালেও ক্যাথলিক ধর্মের বিশ্বাস ও চর্চার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারেননি তিনি। বরং ওই অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তিনি ক্যাথলিক নন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মানুষ তাঁকে ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। কিন্তু নিজের ধর্মের নাম কী—এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা ছিল না। অ্যাঞ্জেলা বলেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের মানুষ আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করতেন, কিন্তু সেই বিশ্বাসের কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় নাম ছিল না। প্রার্থনা ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠরা শেখাতেন, জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন প্রার্থনার মতো হয়। অর্থাৎ শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থনা করাই নয়, বরং প্রতিটি কাজ ও আচরণে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস এবং নৈতিকতার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। অ্যাঞ্জেলার কাছে এই শিক্ষাই ছিল তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনের মূল ভিত্তি। তবে নিজের বিশ্বাসের পরিচয় খুঁজতে গিয়ে একসময় বিভ্রান্তিতে পড়েন তিনি। বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। যে ধর্মের কথাই শুনতেন, সেটি সম্পর্কে পড়াশোনা করতেন, বোঝার চেষ্টা করতেন। কিন্তু কোনো ধর্মের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে পারছিলেন না। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত, সৃষ্টিকর্তার উপাসনা আর সৃষ্টিকর্তা হয়ে যাওয়ার ধারণা এক হতে পারে না। মানুষ কখনোই সৃষ্টিকর্তার সমতুল্য হতে পারে না—এ বিশ্বাস তাঁর কাছে ছিল স্পষ্ট। মুসলিমের সঙ্গে পরিচয়, ইসলামের প্রতি আগ্রহ এভাবেই চলছিল তাঁর ধর্মীয় অনুসন্ধান। একসময় এক মুসলিম ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় অ্যাঞ্জেলার। তাঁদের মধ্যে ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে কথাবার্তা শুরু হলে ইসলাম সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন তিনি। অ্যাঞ্জেলা বলেন, ওই ব্যক্তির কাছ থেকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় জানার পর তিনি বিস্মিত হন। কারণ, মুসলিমদের অনেক ধর্মীয় অনুশীলন ও বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর নিজের শৈশবের শিক্ষা এবং জীবনাচরণের মিল খুঁজে পান। তাঁর মনে হয়, তিনি যে ধরনের আধ্যাত্মিক জীবনযাপনের চর্চা করে এসেছেন, ইসলামের মধ্যেও তার অনেক কিছু রয়েছে। এরপর ইসলাম সম্পর্কে আরও জানার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ইন্টারনেটে বিভিন্ন লেখা ও তথ্য পড়তে শুরু করেন। যতই জানতে থাকেন, ততই ইসলাম তাঁর কাছে অর্থবহ হয়ে উঠতে থাকে। বিশেষ করে সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ, প্রার্থনা এবং জীবনযাপনের নৈতিক দিকগুলো তাঁর আগে থেকে জানা বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। পুরোনো বইয়ের ঝুড়িতে কোরআনের সন্ধান ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়তে থাকায় একদিন একটি মুদি দোকানে গিয়ে পুরোনো বই বিক্রির ছোট্ট একটি ঝুড়ি দেখতে পান অ্যাঞ্জেলা। সেখানে মানুষ পুরোনো বই জমা দিত, আর অন্যরা সেগুলো কিনে নিত। বই বিক্রির অর্থ দাতব্য কাজে ব্যয় করা হতো। বইয়ের স্তূপের ওপর ইসলামবিষয়ক কয়েকটি বই দেখে তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। সেগুলো একসঙ্গে কিনে বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করেন। বইগুলোতে ইসলামের যেসব বিষয় উঠে এসেছিল, সেগুলো তাঁর কাছে ক্রমেই পরিচিত ও অর্থবহ মনে হতে থাকে। একপর্যায়ে পবিত্র কোরআন পড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তবে কোরআন পাঠের শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি ও দ্বিধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কারণ, কোরআনের কিছু বিষয় তাঁর দাদা-দাদির কাছ থেকে শোনা বিশ্বাস ও গল্পের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি। কিছু বিষয় তাঁর কাছে নতুন ও ভিন্ন মনে হয়েছিল। তবুও পড়া বন্ধ করেননি অ্যাঞ্জেলা। ধীরে ধীরে কোরআনের বক্তব্য ও ইসলামের শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট হতে থাকে। একসময় তাঁর মনে হয়, ইসলামের অনেক মৌলিক শিক্ষা ও অনুশীলনের সঙ্গে তাঁর সারা জীবনের আধ্যাত্মিক চর্চার গভীর মিল রয়েছে। নিজের সেই উপলব্ধি প্রকাশ করতে গিয়ে অ্যাঞ্জেলা বলেন, ‘বাহ! আমি তো সারা জীবন ধরেই এসব করে আসছি! অথচ কখনো জানতামই না!’ তাঁর কাছে ইসলাম আর অপরিচিত কোনো বিশ্বাসের নাম ছিল না; বরং দীর্ঘদিন ধরে লালন করা বিশ্বাস ও জীবনবোধকে নতুনভাবে বুঝে নেওয়ার পথ হয়ে ওঠে। নিজের এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অ্যাঞ্জেলা তুলে ধরেছেন ধর্মীয় অনুসন্ধান, শৈশবের শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের এক ভিন্নধর্মী গল্প। তাঁর ভাষ্যে, ইসলামের সঙ্গে পরিচয় তাঁকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—যে বিশ্বাসের চর্চা তিনি সারা জীবন করে এসেছেন, তার সঙ্গে ইসলামের অনেক মৌলিক শিক্ষার মিল রয়েছে।