হিমাদ্রী বড়ুয়ার জিপিএ-৫, ভালো ফল যমজ বোন নিলাদ্রীরও একদিকে জাতীয় দলের জার্সিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব, অন্যদিকে পড়াশোনা ও পরীক্ষার প্রস্তুতি। কখনো অনুশীলন, কখনো জাতীয় দলের ক্যাম্প, আবার কখনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি—এমন ব্যস্ত সূচির মধ্যেই উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় বসেছিলেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়। শনিবার ফল প্রকাশের পর তাঁদের অনেকের মুখেই ফুটেছে হাসি। কেউ পেয়েছেন জিপিএ-৫, কেউ প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছেন। আবার কারও জন্য এবারের ফলাফল ছিল আগের ব্যর্থতা কাটিয়ে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার উপলক্ষ। হকি, টেবিল টেনিস, ফুটবল ও ক্রিকেট—বিভিন্ন খেলার খেলোয়াড়দের ফলাফলে উঠে এসেছে মাঠ ও পড়াশোনার ভারসাম্য রাখার কঠিন বাস্তবতা। তাঁদের কেউ জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকার কারণে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেননি, কেউ পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে দূরে থেকেছেন। তার পরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় থেমে থাকেননি তাঁরা। এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উজ্জ্বল সাফল্য হকির যমজ বোন হিমাদ্রী বড়ুয়ার। তিনি পেয়েছেন জিপিএ-৫। তাঁর যমজ বোন নিলাদ্রী বড়ুয়াও ভালো ফল করেছেন। তাঁর প্রাপ্ত জিপিএ ৪.৮৩। দুজনই বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) শিক্ষার্থী এবং জাতীয় নারী হকি দলের সদস্য। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকার কারণে পরীক্ষার আগে পড়াশোনার জন্য খুব বেশি সময় পাননি দুই বোন। ফলে ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশাও ছিল সীমিত। কিন্তু সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ভালো ফল করায় আনন্দিত তাঁরা। নিলাদ্রী বলেন, ‘ভালোভাবে প্র্যাকটিস করার জন্য সেভাবে পরীক্ষা দিতে পারিনি। বেশি কিছু আশা ছিল না, তারপরও ভালো লাগছে ফল দেখে।’ নিলাদ্রীর কথায় উঠে এসেছে জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের পরিচিত এক বাস্তবতা। নিয়মিত অনুশীলন ও দলের প্রস্তুতির পাশাপাশি পরীক্ষার পড়া শেষ করা সহজ নয়। বিশেষ করে ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনার সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু দুই বোনের ফলাফল তাঁদের প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। পড়াশোনার পাশাপাশি হকি চালিয়ে যেতে চান হিমাদ্রী ও নিলাদ্রী। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা হিমাদ্রীর। তিনি বলেন, ‘ভালো লাগছে, ঢাকাতে ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চাই।’ হিমাদ্রীর জিপিএ-৫ শুধু পরীক্ষার ফল নয়, খেলাধুলার ব্যস্ততার মধ্যেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ধরে রাখার একটি উদাহরণ। এখন তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। হকিতে সাফল্য, পাস করেছেন টেবিল টেনিসের খেলোয়াড়েরাও বিকেএসপির হকি বিভাগ থেকে এবার জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া সাত খেলোয়াড়ের ছয়জনই এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন টেবিল টেনিস খেলোয়াড় খই খই সাই মারমা। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিনি পেয়েছেন জিপিএ ৪.৬৭। খই খইয়ের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে পড়াশোনা ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য রাখার আরেকটি দিক। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বাছাইপর্বে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হয়েছে। ফলে ভালো ফলের আনন্দ থাকলেও খেলোয়াড়ি জীবনে কিছু সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপও রয়েছে। খই খই বলেন, ‘আসলেই একসঙ্গে দুইটা চালানো কঠিন ছিল, পরীক্ষার জন্য আমি সিলেকশন দিতে পারিনি, যে কারণে বড় দুটি গেমস মিস করেছি, তারপরও ফলটা অপ্রত্যাশিত ছিল, খুব ভালো লাগছে।’ একজন প্রতিযোগিতামূলক খেলোয়াড়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা মিস করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। বিশেষ করে জাতীয় পর্যায়ে জায়গা ধরে রাখতে নিয়মিত অনুশীলন, বাছাইপর্ব ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া জরুরি। অন্যদিকে, শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও অবহেলা করার সুযোগ নেই। খই খইয়ের অভিজ্ঞতা এই দুই দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় করার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে। এবার তাঁর লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির পাশাপাশি টেবিল টেনিসে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করার স্বপ্নও নিশ্চয়ই তাঁর সামনে থাকবে। টেবিল টেনিসের জুনিয়র জাতীয় দলের আরও চার খেলোয়াড়—রেশমি তঙচঙ্গা, ঐশি রহমান, নাফিস ইকবাল ও আবুল হাসেম হাসিব—এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছেন। তাঁদের ফলাফলও খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়। ফুটবলের গোলরক্ষকদেরও ভালো ফল ফুটবলেও জাতীয় দলের দুই গোলরক্ষকের ফল আশাব্যঞ্জক। জাতীয় দলের গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণ বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.৭১ পেয়েছেন। অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের গোলরক্ষক ইসমাইল হোসেন মাহিন মানবিক বিভাগ থেকে অর্জন করেছেন জিপিএ ৪.২৫। ফুটবলারদের জন্য নিয়মিত অনুশীলন, দলের সঙ্গে প্রস্তুতি, ম্যাচের সূচি এবং যাতায়াতের ব্যস্ততা সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি ম্যাচ বিশ্লেষণ, শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং দলের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার প্রয়োজনও থাকে। এ ধরনের ব্যস্ততার মধ্যেও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া তাঁদের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। মেহেদী হাসান শ্রাবণ ও ইসমাইল হোসেন মাহিনের ফল দেখিয়েছে, জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। তবে ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও ফুটবল—দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে যেতে তাঁদের সময় ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত পড়াশোনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। দ্বিতীয় চেষ্টায় বাধা পেরোলেন মারুফা জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের পেসার মারুফা আক্তারের জন্য এবারের এইচএসসি ফলাফল ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছর একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ায় এবার অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে আবার পরীক্ষায় বসেন তিনি। দ্বিতীয় চেষ্টায় সেই বাধা পেরিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার। তাঁর প্রাপ্ত গ্রেড বি। মারুফার এই সাফল্য অন্যদের মতো জিপিএ-৫ বা সর্বোচ্চ ফলের গল্প নয়। বরং আগের ব্যর্থতা কাটিয়ে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প। খেলাধুলার ব্যস্ততার মধ্যে একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার পর পরের বছর আবার প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় বসা তাঁর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ ছিল। জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলার সময় অনুশীলন, ম্যাচ ও দলের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় খেলোয়াড়দের। সেই ব্যস্ততার মধ্যেও অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন মারুফা। এবার উত্তীর্ণ হওয়ায় তাঁর সামনে পড়াশোনার পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। মাঠ ও শ্রেণিকক্ষ—দুই জায়গাতেই এগিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ জাতীয় ও বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড়দের এবারের ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। প্রতিভা ও কঠোর অনুশীলনের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সময়, পরিকল্পনা এবং সহায়ক পরিবেশ। জাতীয় দলের ক্যাম্প বা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার সূচি পরীক্ষার প্রস্তুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে তাঁদের অনেক সময় একটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। হিমাদ্রী ও নিলাদ্রীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ক্যাম্পের ব্যস্ততার মধ্যেও ভালো ফল করা সম্ভব। খই খই সাই মারমার বক্তব্যে উঠে এসেছে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা মিস করার বাস্তবতা। আর মারুফা আক্তারের ফলাফল মনে করিয়ে দিয়েছে, একবার ব্যর্থ হলেও আবার চেষ্টা করে উত্তীর্ণ হওয়া যায়। খেলোয়াড়দের জন্য শিক্ষা ও খেলাধুলাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে দুটি ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। পরীক্ষার সময়সূচি ও জাতীয় দলের ক্যাম্পের মধ্যে সমন্বয়, পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তাঁদের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় দলের জার্সিতে দেশের হয়ে লড়াই করা যেমন তাঁদের দায়িত্ব, তেমনি শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়াও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এবারের এইচএসসি ফলাফলে উত্তীর্ণ খেলোয়াড়দের সাফল্য তাই কেবল পরীক্ষার ফলের হিসাব নয়; মাঠের ব্যস্ততার মধ্যেও শিক্ষার পথ ধরে রাখার গল্প।