৫ নভেম্বর ঢাকায় টুর্নামেন্ট শুরু, অথচ প্রচার-প্রচারণা ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা; মাঠ ভাড়া ও টিকিটের আয় নিয়েও জটিলতা দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল মানেই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ঘিরে আলাদা উন্মাদনা। বাংলাদেশে আয়োজন হলে সেই উত্তেজনা আরও বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু ৫ নভেম্বর ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাওয়া এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে এখনো তৈরি হয়নি প্রত্যাশিত উৎসবের আবহ। বরং আয়োজনের দায়িত্ব, প্রচার-প্রচারণা, দলগুলোর যাতায়াত ও আবাসন এবং সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে একের পর এক জটিলতা সামনে আসছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই এমন পরিস্থিতিতে আয়োজকদের সমন্বয় ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাফের কোনো আসর শুরুর আগে সাধারণত ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়। কখনো বড় আয়োজন না থাকলেও টুর্নামেন্টের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দলের অধিনায়ক ও কোচদের ট্রফির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার রীতি রয়েছে। এবার সেই পরিচিত আয়োজনও হচ্ছে না। বুধবার সংবাদ সম্মেলনে ট্রফি উন্মোচন করা হবে না বলে জানিয়েছেন টুর্নামেন্টের স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব রশিদ। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে ট্রফি উন্মোচন হচ্ছে না। আমরা ভিন্ন পরিকল্পনা করছি, ভিন্নভাবে এটি উপস্থাপন হবে।’ তবে সেই বিকল্প আয়োজন কী, কখন এবং কোথায় হবে—তা স্পষ্ট করেননি তিনি। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকায় প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দলগুলোর যাতায়াত ও আবাসনে ভোগান্তি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, খেলা শুরুর অন্তত দুই দিন আগে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পৌঁছানোর কথা। সেই হিসাবে আজকের মধ্যে সফরকারী দলগুলোর ঢাকায় আসার কথা ছিল। অন্য দলগুলো এলেও মালদ্বীপ নির্ধারিত সময়ে আসেনি। এ নিয়ে টিএসএর টিকিট ব্যবস্থাপনা ও সাফের সময়সূচি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মালদ্বীপ দলকে আজকের (মঙ্গলবার) টিকিট দেয়নি টিএসএ। ফলে তাদের ঢাকায় আসতে দেরি হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সজীব রশিদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা নিজেদের উদ্যোগে টিকিট কেটে এসেছে, পরে সেই অর্থ পরিশোধ করেছে টিএসএ। মালদ্বীপও নিজেদের টিকিট কেটে আসবে। দলটির প্রথম ম্যাচ ৮ নভেম্বর হওয়ায় সাফ কিছুটা সময়ের ছাড় দিয়েছে এবং তারা ৫ নভেম্বর ঢাকায় পৌঁছাবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মালদ্বীপের দেরিতে আসার কারণ টিকিট না দেওয়া নয়; বরং ম্যাচের সূচি বিবেচনায় সাফের দেওয়া ছাড়। তবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দলগুলোর আগমন, আবাসন ও প্রস্তুতির সময়সূচি নিয়ে এমন ভিন্ন বক্তব্য আয়োজনে সমন্বয়ের প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। ঢাকায় পৌঁছেও ভোগান্তি এড়াতে পারেনি সফরকারী দলগুলো। সোমবার ভুটান দলকে বিমানবন্দরে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কা দল হোটেলসংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে। টুর্নামেন্টের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব টিএসএর হাতে থাকলেও সাফের মতো আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থা এসব সমস্যা থেকে দায় এড়াতে পারে না। কারণ দলগুলোর যাতায়াত, আবাসন ও প্রতিযোগিতার সামগ্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি টুর্নামেন্টের গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাফের বেতনভুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংস্থাটির সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও সমস্যা সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। স্টেডিয়ামে প্রচার নেই, শেষ মুহূর্তে ব্র্যান্ডিং ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে সাফের মতো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে, অথচ মাঠ ও আশপাশে এখনো চোখে পড়ার মতো ব্যানার, ফেস্টুন বা প্রচারসামগ্রী দেখা যায়নি। সাধারণত বড় টুর্নামেন্টের আগে স্টেডিয়াম ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা হয়। এবার সেই কাজও শেষ মুহূর্তে শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছে টিএসএ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আজ রাত থেকে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ শুরু হবে। সংবাদ সম্মেলনের সময় নিয়েও ছিল অনিশ্চয়তা। বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন হওয়ার তথ্য সাংবাদিকেরা পেয়েছেন প্রায় মধ্যরাতে। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সংবাদ কাভার করতে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির জন্য আগেভাগে তথ্য দেওয়া জরুরি। শেষ মুহূর্তে সূচি জানানোয় তাঁদের কাজেও অসুবিধা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বাফুফে, সাফ ও টিএসএর মধ্যে দায়িত্ব ও সমন্বয়ের বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়ায় আয়োজনটি এক ধরনের গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। ফুটবলসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ গত বছরের বিতর্কিত ‘ল্যাটিন বাংলা’ টুর্নামেন্টের সঙ্গে এবারের ব্যবস্থাপনার তুলনা টানছেন। সে সময় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের নাম ব্যবহার করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টুর্নামেন্ট আয়োজনের উদ্যোগ নিলেও অব্যবস্থাপনার কারণে খেলা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে বিদেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল। এবারের সাফ অবশ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃত প্রতিযোগিতা; তবে আয়োজনের আগে যে ধরনের সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে ফুটবলসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়ছে। মাঠ ভাড়া ৯ লাখ টাকা, টিকিটের আয় নিয়ে আলোচনা টুর্নামেন্টের স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ জাতীয় স্টেডিয়ামের মাঠ ভাড়া নিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছ থেকে। পরিষদের নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী, প্রতিদিন ৬০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত মাঠ বরাদ্দ দেওয়ায় মোট ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ টাকা। তবে মাঠ ব্যবহারের ভাড়ার বাইরে ফ্লাডলাইট, ডিজিটাল বোর্ডসহ অন্যান্য সুবিধার জন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (ক্রীড়া) জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান ভাড়ার হার অনুযায়ী স্টেডিয়াম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই ভাড়া পর্যালোচনা করা হবে। জাতীয় স্টেডিয়ামের মালিকানা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের হলেও মাঠটি ফুটবল ও অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন ব্যবহার করে। অতীতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের সময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) স্টেডিয়ামটি ব্যবহার করেছে। সে সময় গেটমানির ১৫ শতাংশ এবং প্রচারস্বত্বের ১০ শতাংশ অর্থ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পাওয়ার কথা থাকলেও তা আদায় করা যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এবার সাফের স্বত্ব ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব টিএসএর হাতে থাকায় প্রতিষ্ঠানটিই টিকিট বিক্রি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক বিষয় দেখভাল করছে। তবে টিকিট বিক্রি থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কত অংশ পাবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জাহেদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, টিকিট বিক্রি মাত্র শুরু হয়েছে। এ থেকে পরিষদের আয়ের অংশ নিয়ে আলোচনা চলছে। মাঠ ভাড়া ও অন্যান্য সুবিধার অর্থ নির্ধারিত হলেও টিকিট বিক্রি থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রাপ্য অংশ নিয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি। টুর্নামেন্ট শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতেই এই আলোচনা চলা বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। প্রেসবক্সের ছাদ নিয়েও জটিলতা জাতীয় স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে আসন রয়েছে ১১০টি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ম্যাচ কাভার করতে প্রায়ই দুই শতাধিক সাংবাদিক উপস্থিত হন। ফলে প্রেসবক্সে জায়গা সংকট তৈরি হয়। প্রেসবক্সের পেছনের অংশ থেকে খেলা ভালোভাবে দেখা যায় না। সাংবাদিকদের অনুরোধে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একসময় প্রেসবক্সের ওপরের ছাদে ১০০টি চেয়ার বসিয়েছিল। গত বছর এশিয়ান কাপের বাছাইপর্বের ম্যাচে বাফুফে সেই আসনের টিকিটও বিক্রি করে। সাংবাদিকদের আপত্তির পর বাফুফে সভাপতি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিলেও টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়নি। এবার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সম্প্রতি স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সের ছাদ পরিদর্শন করে সেটি সাংবাদিকদের ব্যবহারের নির্দেশনা দেন। এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত স্কাইলাউঞ্জ সাংবাদিকদের জন্য বরাদ্দ দিয়ে চিঠি জারি করে। বাফুফেও সাফকে ওই আসনগুলোর টিকিট বিক্রি না করার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু টুর্নামেন্টের স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ ৫ নভেম্বর শুধু ম্যাচের দিন স্কাইলাউঞ্জ ব্যবহারের জন্য সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যেখানে পুরো টুর্নামেন্টের সময়ের জন্য জায়গাটি সাংবাদিকদের বরাদ্দ দিয়েছে, সেখানে টিএসএর চিঠিতে শুধু প্রথম দিনের কথা উল্লেখ থাকায় নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে বাফুফের সহসভাপতি ফাহাদ করিমও সাংবাদিকদের অনুরোধ করছেন। অথচ বাফুফের বক্তব্য, টুর্নামেন্টের আয়োজন, টিকিটের দাম ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের হাতে নেই; এসব দেখছে সাফ ও স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠান টিএসএ। তাহলে টিএসএর কাছে সাংবাদিকদের জন্য বরাদ্দ করা আসন ব্যবহারের অনুরোধ কেন করতে হচ্ছে বাফুফের সহসভাপতিকে—এ প্রশ্ন উঠেছে। দায় কার, জবাবদিহি করবে কে এবারের সাফে স্বাগতিক বাংলাদেশ হলেও আয়োজনের বড় অংশের দায়িত্ব নিয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিএসএ। ফলে বাফুফে, সাফ এবং টিএসএর দায়িত্বের সীমারেখা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। মাঠ ভাড়া, টিকিট বিক্রি, প্রচারস্বত্ব, দলগুলোর যাতায়াত ও আবাসন, সংবাদ সম্মেলন এবং সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই একাধিক পক্ষের সম্পৃক্ততা রয়েছে। কিন্তু কোনো সমস্যা দেখা দিলে কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এবং কার কাছে জবাবদিহি করতে হবে, তা পরিষ্কার নয়। একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতার সফল আয়োজন শুধু মাঠে খেলা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলগুলোর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অবস্থান, দর্শকদের জন্য প্রচার ও টিকিট ব্যবস্থাপনা, সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ এবং আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতাও এর অংশ। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এসব বিষয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তা দ্রুত সমাধান করা না গেলে মাঠের বাইরের অব্যবস্থাপনাই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসতে পারে। সাফের ম্যাচে মাঠের লড়াই কেমন হবে, তা দেখার অপেক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলপ্রেমীরা। কিন্তু তার আগেই আয়োজকদের সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বের টানাপোড়েন টুর্নামেন্টের উৎসবের আবহকে ম্লান করে দিচ্ছে।