প্রকাশ :: ... | ... | ...

ডারউইন টেস্ট : হাসানের আগুনে উড়ল ফানুশ, বাংলাদেশের রূপকথার শুরু


সংযুক্ত ছবি

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম দিনেই দারুণ এক বার্তা দিল বাংলাদেশ। ব্যাটে-বলে দাপুটে পারফরম্যান্সে ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে অলআউট করার পর দিন শেষে বাংলাদেশ ১ উইকেটে ৯৬ রান তুলেছে। ম্যাচ শুরুর আগে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণ নিয়ে যে শঙ্কা ছিল, দিন শেষে তার অনেকটাই উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটাররা। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসে এটি বাংলাদেশের অন্যতম সেরা দিন হয়ে থাকল। দিনটির নায়ক অবশ্যই হাসান মাহমুদ। ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে মাত্র ৫৫ রান দিয়ে নিয়েছেন ৬ উইকেট। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তিন সংস্করণ মিলিয়ে পাঁচ উইকেট নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম বোলারও হলেন তিনি। টেস্টে এটি হাসানের তৃতীয়বার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি। এর আগে ভারত ও পাকিস্তানের মাটিতে এমন সাফল্য পেয়েছিলেন তিনি। মারারা স্টেডিয়ামের সবুজ উইকেটে টস জিতে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ওপেনারদের চাপে রাখেন হাসান। ট্রাভিস হেড ও জেইক ওয়েদেরল্ড মিলে ৪৫ রান যোগ করলেও জুটি ভাঙার পর দ্রুতই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে বাংলাদেশ। ওয়েদেরল্ডকে ফিরিয়ে প্রথম সাফল্য এনে দেন হাসান। পরের ওভারেই হেডকেও সাজঘরে ফেরান তিনি। এরপর ইবাদত হোসেন চৌধুরী বিদায় করেন মার্নাস লাবুশেনকে। ২০ বল খেলে মাত্র ১ রান করেন এই অভিজ্ঞ ব্যাটার। ক্যামেরন গ্রিন এরপর তাসকিন আহমেদের বলে ছক্কা হাঁকালেও পরের বলেই তাকে ফিরিয়ে দেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ পেসার। লাঞ্চের আগেই অস্ট্রেলিয়ার চার উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। লাঞ্চের পর কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিকেরা। স্টিভেন স্মিথ ও অ্যালেক্স কেয়ারি মিলে ৫৫ রানের জুটি গড়ে বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। স্মিথ ৭১ রানের ইনিংস খেলেন। তবে পানি পানের বিরতির পর প্রথম বলেই কেয়ারিকে বোল্ড করে জুটি ভাঙেন ইবাদত। এরপর আবার শুরু হয় হাসান মাহমুদের দাপট। প্যাট কামিন্স ও মিচেল স্টার্ককে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। দিনের সবচেয়ে বড় উইকেটটি আসে স্মিথকে ফিরিয়ে। ক্রিজ ছেড়ে বড় শট খেলতে গিয়ে লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দেন অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটার। এরপর জশ হেইজেলউডকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসও শেষ করে দেন হাসান। ৫৩ ওভারে ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের হয়ে হাসান ৬টি, তাসকিন ২টি এবং ইবাদত ২টি উইকেট নেন। জবাবে বাংলাদেশের শুরুটাও ছিল আত্মবিশ্বাসী। অস্ট্রেলিয়ার ভয়ংকর পেসত্রয়ী মিচেল স্টার্ক, জশ হেইজেলউড ও প্যাট কামিন্সের সামনে তানজিদ হাসান ও সাদমান ইসলাম প্রথম কয়েক ওভার নিরাপদে কাটিয়ে দেন। ৮ ওভারের মধ্যেই আসে ৩৫ রান। তবে ২০ রান করে সাদমান স্টার্কের বলে আউট হন। এই উইকেটের মাধ্যমে রঙ্গনা হেরাথকে ছাড়িয়ে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে বাঁহাতি বোলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক হন স্টার্ক—৪৩৪ উইকেট নিয়ে। সাদমান ফেরার পর তানজিদ হাসানের সঙ্গে যোগ দেন মুমিনুল হক। দুজন মিলে আর কোনো বিপদ হতে দেননি। দিনের শেষ পর্যন্ত ২৪ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ৯৬ রান। তানজিদ ৬৭ বলে ৩২ এবং মুমিনুল ৪৯ বলে ৩৫ রানে অপরাজিত। মুমিনুলের এই ইনিংসের আরেকটি তাৎপর্য আছে। টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন তামিম ইকবালকে। সবুজ উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের পেস আক্রমণের সামনে দিনের শেষ ভাগে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল বিশেষভাবে স্বস্তিদায়ক। তানজিদ ও মুমিনুলের ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, বল ছাড়ার ক্ষেত্রে ছিল বিচক্ষণতা এবং সুযোগ পেলেই রান নেওয়ার আত্মবিশ্বাস। দিন শেষে ধারাভাষ্যে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারের মন্তব্যটিও যেন দিনের সারাংশ হয়ে উঠল—**বাংলাদেশের দিন, এবং সত্যিই পুরোপুরি বাংলাদেশের দিন।** ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে প্রথম দিনেই এমন দাপট বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে বড় আত্মবিশ্বাসের উৎস। তবে ম্যাচের এখনও অনেকটা পথ বাকি। দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কতটা বড় লিড গড়ে তুলতে পারেন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। উইকেট ও রানের সঙ্গে এই সম্মানও প্রথম দিনে বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি! সংক্ষিপ্ত স্কোর: অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৯৮ (হেড ২২, ওয়েদেরল্ড ২৩, লাবুশেন ১, স্মিথ ৭১, গ্রিন ১৩, কেয়ারি ১৯, ওয়েবস্টার ১২, কামিন্স ৯, স্টার্ক ১, লায়ন ৭, হেইজেলউড ৪*; তাসকিন ১৬-২-৫৫-২, হাসান মাহমুদ ১৭-৩-৫৫-৬, ইবাদত ১১-২-৩৯-২, মিরাজ ৪-০-১২-০, তাইজুল ৫-০-২৪-০)। বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৪ ওভারে ৯৬/১ (সাদমান ২০, তানজিদ ৩২*, মুমিনুল ৩৫*; স্টার্ক ৭-১-২৮-১, হেইজলেউড ৭-২-১৯-০, গ্রিন ৩-১-১২-০, কামিন্স ৪-০-১৪-০, লায়ান ৩-০-১৬-০) (প্রথম দিন শেষে)