সিলেটের মাঠে ব্যাট হাতে ইতিহাস গড়েছেন তাওহীদ হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের রেকর্ড গড়েছেন এই ব্যাটসম্যান। ভেঙেছেন মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রানের কীর্তি, ছাড়িয়ে গেছেন সাকিব আল হাসানের এক দিনে সর্বোচ্চ রান তোলার রেকর্ডও। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের মাত্র তৃতীয় টেস্টেই একের পর এক কীর্তি গড়েছেন হৃদয়। অথচ টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুটা ভালো ছিল না তাঁর। প্রথম চার ইনিংসে সংগ্রহ ছিল মাত্র ৫৪ রান। মিরপুর টেস্টে বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন তিনি। সিলেটে ব্যাট হাতে সেই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন দারুণভাবে। তাঁর ২৪২ রানের ইনিংসটি এখন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। এর আগে এই রেকর্ড ছিল মুশফিকুর রহিমের দখলে। ২০১৮ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২১৯ রান করেছিলেন তিনি। হৃদয় এবার মুশফিককে ছাড়িয়ে গেছেন ২৩ রানে। ছক্কা মারার ক্ষেত্রেও অনন্য কীর্তি গড়েছেন হৃদয়। তাঁর ১১টি ছক্কা টেস্টে এক ইনিংসে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ছয়জন ব্যাটসম্যান এক ইনিংসে ১১টি করে ছক্কা মেরেছেন। এই তালিকায় সর্বোচ্চ ১২ ছক্কার রেকর্ড ওয়াসিম আকরাম ও যশস্বী জয়সোয়ালের। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এত দিন ছিল তামিম ইকবালের। ২০১৫ সালে খুলনায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭টি ছক্কা মেরেছিলেন তিনি। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়ার কীর্তিও গড়েছেন হৃদয়। বাংলাদেশের হয়ে এর আগে কেউ এই কীর্তি গড়তে পারেননি। সব মিলিয়ে টেস্টে ডাবল সেঞ্চুরি করা চতুর্থ বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান তিনি। তাঁর আগে মুশফিকুর রহিম তিনটি এবং সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল একটি করে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন। দলের ইনিংসে হৃদয়ের অবদানও রেকর্ড গড়েছে। বাংলাদেশের ৩৮৬ রানের মধ্যে তাঁর একার সংগ্রহ ২৪২ রান, যা দলের মোট রানের ৬২ দশমিক ৬৯ শতাংশ। পূর্ণাঙ্গ ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের এটিই সর্বোচ্চ অবদান। এর আগে ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৪৩ রানে অলআউট হওয়া ইনিংসে লিটন দাসের ২৫ রান ছিল সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত অবদান। দলের মোট রানের ৫৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এসেছিল তাঁর ব্যাট থেকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস এখন হৃদয়ের। ২০১৮ সালে মিরপুরে মাহমুদউল্লাহর করা ১৩৮ রান ছিল আগের সর্বোচ্চ। সিলেটের মাঠে বাংলাদেশিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রানের ইনিংসের রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। ২০২৫ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদুল হাসানের ১৭১ রানের ইনিংসকে পেছনে ফেলেছেন হৃদয়। শেষ দিকের ব্যাটিংয়েও তাঁর ইনিংসটি নতুন নজির তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সপ্তম উইকেট পড়েছিল ১৮৪ রানে। এরপর শেষ তিন উইকেটে যোগ হয়েছে আরও ২০২ রান, যা এই সংস্করণে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ তিন উইকেটে ১৯৮ রান যোগ করেছিল বাংলাদেশ। এক দিনে রান তোলার ক্ষেত্রেও নতুন রেকর্ড গড়েছেন হৃদয়। ২৯ রান নিয়ে দিনের খেলা শুরু করে এদিন আরও ২১৩ রান যোগ করেন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে এক দিনে কোনো ব্যাটসম্যানের এটিই সর্বোচ্চ রান। এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংস খেলার পথে এক দিনে ২১২ রান করেছিলেন সাকিব আল হাসান। বাউন্ডারি থেকেও বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ রান এসেছে হৃদয়ের ব্যাটে। ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় মোট ৩৩টি বাউন্ডারি মেরেছেন তিনি। এসব বাউন্ডারি থেকে এসেছে ১৫৪ রান। এর আগে ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২১৭ রানের ইনিংসে ৩১টি চারের সাহায্যে ১২৪ রান তুলেছিলেন সাকিব। সমালোচনা পেছনে ফেলে নিজের তৃতীয় টেস্টেই হৃদয়ের এমন ব্যাটিং বাংলাদেশের ক্রিকেটে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান, ছক্কা, দলের ইনিংসে অবদান, শেষ দিকের জুটি এবং এক দিনে রান তোলাসহ একাধিক রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়েছেন এই তরুণ ব্যাটসম্যান।