প্রকাশ :: ... | ... | ...

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে ডারউইনে নতুন স্বপ্ন, অস্ট্রেলিয়ার দুঃখ


সংযুক্ত ছবি

বাংলাদেশের কাছে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক টেস্ট হার শুধু দুই দলের ফলাফলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই জয় নতুন করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানচিত্রে তুলে এনেছে অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরির রাজধানী ডারউইনকে। ২২ বছর পর সেখানে টেস্ট ক্রিকেট ফেরার পর বাংলাদেশের জয় ভেন্যুটিকে ঘিরে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা—বিশেষ করে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ভবিষ্যতে টেস্ট আয়োজনের স্বপ্ন। নর্দান টেরিটরি ক্রিকেটের প্রধান নির্বাহী গ্যাভিন ডোভির কাছে তাই অনুভূতিটা একেবারেই দ্বৈত। একদিকে ডারউইনকে নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের অসাধারণ পারফরম্যান্সে তিনি উচ্ছ্বসিত; অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ায় তার রয়েছে হতাশাও। ডোভির ভাষায়, ডারউইনের জন্য এটি ছিল ঐতিহাসিক একটি সপ্তাহ। বিশ্বজুড়ে মানুষ এখন এই শহরের উইকেট, মাঠ ও আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছে। বিশেষ করে ‘ওল্ড স্কুল’ ধাঁচের টেস্ট উইকেটে একটি ছোট অঞ্চলের ভেন্যুতে বাংলাদেশের মতো তুলনামূলকভাবে ছোট ক্রিকেট দেশের জয় ডারউইনের জন্য বড় প্রচার হয়ে এসেছে। ডারউইনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইনে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টেই স্বাগতিকদের প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশ। স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচ খেলেছিল খালেদ মাহমুদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। এরপরও ডারউইনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের যোগাযোগ ছিল। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ‘এ’ দল, হাই পারফরম্যান্স ইউনিট ও ইমার্জিং দলের ক্রিকেটাররা ডারউইনের টপএন্ড টি-টোয়েন্টিতে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। হাসান মাহমুদ ও তানজিদ হাসানসহ কয়েকজন ক্রিকেটারের ডারউইন সম্পর্কে আগের অভিজ্ঞতাও ছিল। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও ২০১৭ সালে ডেভেলপমেন্ট সফরে এই অঞ্চলে এসেছিলেন। ফলে এবারের সফরে ডারউইনের পরিবেশ ও কন্ডিশন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কাছে পুরোপুরি অপরিচিত ছিল না। সেটিও হয়তো ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে কাজ করেছে। প্রশ্ন হলো, অস্ট্রেলিয়ার মূল ক্রিকেট ভেন্যুগুলো থাকতে এত দূরের ডারউইনে টেস্ট আয়োজনের প্রয়োজন কেন? এর পেছনে রয়েছে নর্দান টেরিটরির ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলে যখন শীতকাল, তখন ডারউইনের আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে উষ্ণ। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট শহরগুলোতে ‘ফুটি’ বা অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল মৌসুম জমজমাট থাকে। এই বাস্তবতায় ডারউইন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের জন্য একটি বিকল্প আন্তর্জাতিক ভেন্যু হতে পারে। ২০০৩ ও ২০০৪ সালে সেখানে দুটি টেস্ট আয়োজনের পর দীর্ঘ বিরতি ছিল। বাংলাদেশের বিপক্ষে এবারের ম্যাচটি সেই দীর্ঘ বিরতির পর ডারউইনে টেস্ট ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন। বাংলাদেশের জয় সেই প্রত্যাবর্তনকে আরও স্মরণীয় করে দিয়েছে। এই ম্যাচের পর নর্দান টেরিটরি ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন এখন—ডারউইনকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যুতে পরিণত করা। এরই মধ্যে গত বছর এখানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সাদা বলের সিরিজ হয়েছে। আগামী বছর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও ওয়ানডে সিরিজ আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে তিন সংস্করণের ক্রিকেটের সঙ্গেই নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছে ডারউইন। ডোভির লক্ষ্য আরও বড়। তিনি চান আগামী ভবিষ্যৎ সফরসূচিতে নর্দান টেরিটরির জন্য নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাখা হোক। আদর্শ পরিস্থিতিতে টানা কয়েক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন করতে চান তারা—যেখানে টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে এবং টেস্ট, তিন সংস্করণই থাকবে। ডারউইনের সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য অবকাঠামো নয়, অর্থনীতি। অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত উত্তরে একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করতে মূল ভূখণ্ডের তুলনায় খরচ অনেক বেশি। ক্রিকেটার, কর্মকর্তা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিগত কর্মী—সবাইকে দূরবর্তী অঞ্চলে নিয়ে যেতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সম্প্রচার ও আয়োজন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহীর বক্তব্যেও এই বাস্তবতা উঠে এসেছে। তার মতে, ডারউইনের মতো জায়গায় টেস্ট আয়োজন তুলনামূলকভাবে কঠিন এবং ব্যয়বহুল। তাই নিয়মিত সাদা বলের ক্রিকেট দিয়ে এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিধি বাড়ানো সম্ভবত বেশি বাস্তবসম্মত। তবে এই ব্যয়ের বিপরীতে রয়েছে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাব্য লাভ। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ হাজার ৩৫২ দর্শকের উপস্থিতি ডারউইনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দর্শকদের প্রায় অর্ধেক এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য রাজ্য থেকে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুধু মাঠের টিকিট বিক্রির বিষয় নয়। এর সঙ্গে হোটেল, পরিবহন, পর্যটন, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ব্যবসারও সম্পর্ক রয়েছে। এই জায়গাতেই নর্দান টেরিটরি সরকার ও পর্যটন সংস্থাগুলোর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াও মনে করছে, স্থানীয় সরকার ও পর্যটন খাতের সহায়তা থাকলে অতিরিক্ত আয়োজন ব্যয়ের একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। ডারউইনের আরেকটি বড় শক্তি হলো টপএন্ড টি-টোয়েন্টি। প্রতিযোগিতাটি প্রতি বছর বড় হচ্ছে এবং বিদেশি দলের অংশগ্রহণও বাড়ছে। বাংলাদেশ টানা তৃতীয়বারের মতো এই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে। এবার অস্ট্রেলিয়ার পাঁচটি দলের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দল, নেপাল জাতীয় দল এবং হায়দরাবাদ কিংসমেন একাডেমিও অংশ নিচ্ছে। ডোভির মতে, টুর্নামেন্টটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিগ ব্যাশের পর অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হিসেবে এর পরিচিতি তৈরি হচ্ছে। এটি ডারউইনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের আগে নিয়মিত উচ্চমানের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টির মাধ্যমে একটি ভেন্যুর সক্ষমতা প্রমাণ করা যায়। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় অস্ট্রেলিয়ার জন্য হতাশার হলেও নর্দান টেরিটরির জন্য এটি যেন এক ধরনের প্রচারণা। একটি টেস্ট ম্যাচ সাধারণত একটি দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ফলাফল হিসেবে লেখা হয়। কিন্তু ডারউইনের ক্ষেত্রে এবারের ম্যাচটি হয়তো আরও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। বিশ্ব ক্রিকেটের দর্শকরা এখন জানেন—ডারউইনেও আন্তর্জাতিক মানের টেস্ট ক্রিকেট হতে পারে, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ উইকেট তৈরি সম্ভব এবং দর্শকরাও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখতে আগ্রহী। ডোভির উচ্ছ্বাসের মূল কারণ এখানেই। বাংলাদেশের জয় ডারউইনকে শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ভেন্যু হিসেবে নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের নতুন সীমান্ত হিসেবে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আর বাংলাদেশের জন্য এই জয়? সেটি শুধু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য নয়—ডারউইনের ক্রিকেট ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সঙ্গেও বাংলাদেশের নামকে আবারও জড়িয়ে দিল।