প্রকাশ :: ... | ... | ...

হতাশা ছিল, তবে হাল ছাড়েননি মোসাদ্দেক


সংযুক্ত ছবি

প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচ-সেরা হয়ে মোসাদ্দেক হোসেন শোনালেন তার লড়াইয়ের গল্প। আক্ষেপ, হতাশা, লড়াই, এই শব্দগুলিই গত কয়েক বছরে ছিল মোসাদ্দেক হোসেনের নিত্য সঙ্গী। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের পর মৌসুম অসাধারণ পারফর্ম করেও জাতীয় দলের দুয়ার খোলা পাননি। কখনও কখনও মুষড়ে পড়েছেন। তবে নুইয়ে পড়েননি। নতুন করে লড়াইয়ে নেমেছেন। মনের কোণে আশার প্রদীপ যে জ্বলছিল! জাতীয় দলের ফেরার দিনটিতে দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে দলকে জিতিয়ে এই অলরাউন্ডার শোনালেন সেই সময়ের গল্প। প্রায় চার বছর পর ওয়ানডে দলে ফিরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ৭০ বলে ৮৬ রানের অপরাজিত ইনিংস উপহার দেন মোসাদ্দেক। পরে দুটি উইকেট ও দুর্দান্ত একটি ক্যাচ নিয়ে তিনিই জেতেন ম্যান অব দা ম্যাচের পুরস্কার। এই ম্যাচের আগে সবশেষ ওয়ানডে খেলেন তিনি ২০২২ সালের অগাস্টে। ওই বছরের নভেম্বরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর জাতীয় দল থেকে ছিটকে পড়েন, সেই দূরত্ব আর ঘোচাতে পারছিলেন না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ও বিপিএলে তার পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। কিন্তু একদিনের ম্যাচের সংস্করণে ঘরোয়া ক্রিকেটে দেশের মূল প্রতিযোগিতা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের পর মৌসুম তার পারফরম্যান্স ছিল অবিশ্বাস্য। সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে চোখ কপালে উঠতে পারে অনেকের। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৪৭ গড় ও ৯৬.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৬৫৮ রান। ওভারপ্রতি ৪.৫৩ রান দিয়ে ১৬ উইকেট। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ৭৯.২০ গড় ও ১২৩.৭৫ স্ট্রাইক রেটে ৩৯৬ রান। ওভারপ্রতি ৩.৮৪ রান দিয়ে ২০ উইকেট। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ৪৮.৭০ গড় ও ১০৬.৩৩ স্ট্রাইক রেটে ৪৮৭ রান। ওভারপ্রতি ৪.০৪ রান দিয়ে ৩০ উইকেট। এবার দলে ডাক পাওয়ার আগ পর্যন্ত ৭৭.৫০ গড়ে ও ১২৯.১৬ স্ট্রাইক রেটে ৩১০ রান। ওভারপ্রতি ৩.৭৪ রান দিয়ে ১২ উইকেট। সঙ্গে ছিল দুর্দান্ত নেতৃত্বও। বিশেষ করে, গত মৌসুমে কঠিন বাস্তবতার মধ্যে যেভাবে তার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আবাহনী লিমিটেড, সেটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে ঘরোয়া ক্রিকেটের ইতিহাসে। এমন অতিমানবীয় অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের পরও জাতীয় দলের ডাক না এলে তাড়না মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। মোসাদ্দেকও নিজের সঙ্গে লড়েছেন। যখনই হতাশা গ্রাস করেছে, তখনই আবার নিজেকে জাগিয়ে তুলেছেন সুদিন ফেরার আশায়, ‘হতাশা ছিল। খুব সহজ সময় ছিল না আমার জন্য। আমার লড়াইয়ের সময়টা হয়তো অনেকেই আপনারা দেখেছেন, হয়তো অনেকে দেখেননি। ওই জায়গা থেকে আমি সবসময় ধৈর্য ধরার চেষ্টা করেছি এবং নিজের কাজগুলো করার চেষ্টা করেছি। এটা মাথার মধ্যে ছিল যে, একটা সুযোগ যখন আসবে, সেই সুযোগ যেন ভালোভাবে নিতে পারি। গত কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটে যেভাবে খেলছিলাম, এই বিশ্বাসটা ছিল যে এটা চালিয়ে যেতে পারলে একটা না একটা সময়ে আমার সুযোগ আসবে। যতটুকু না চেয়েছি, আল্লাহ তার থেকে অনেক বেশি দিয়েছেন।” একসময় সীমিত ওভারের ক্রিকেটে নিয়মিত মুখই ছিলেন বাংলাদেশ দলে। সেই সময়টা অতীত হয়ে গেছে অনেক আগেই। অনেক লড়াই আর অপেক্ষার পর অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সময়ের দেখা পেয়েছেন। জাতীয় দল থেকে দূরে থাকার দীর্ঘ এই প্রহরে অনুভূতিগুলোয় মরচে পড়ে গিয়েছিল। তবে ফেরার পর সতীর্থদের ভালোবাসায় দূর সরে গেছে সব অস্বস্তি, ‘আমি কৃতজ্ঞ টিম ম্যানেজমেন্টের প্রতি। উনারা যেভাবে আমার পাশে থেকেছেন, খেলার শুরুর আগে যেভাবে স্বাধীনতা আমাকে দিয়েছেন, আমাকে স্রেফ বলা হয়েছে আমার খেলাটাকে উপভোগ করতে। ওই জিনিসটা খেলার সময় মাথার মধ্যে ছিল না যে অনেকদিন পরে এসেছি বা কিছু। পরিস্থিতি যা দাবি করছিল, আমার কাছে মনে হয়েছে যে, ওভাবে করেই যাওয়া উচিত। আমি স্রেফ আমার কাজটা করার চেষ্টা করেছি। অধিনায়ক থেকে শুরু করে সবাই সাপোর্ট করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যেহেতু আমি এতদিন পরে এসেছি, ওরা সবাই মিলে চাইছে যেন আমি ওই অনুভূতি না পাই যে এতদিন পরে এসেছি। আবারও পুরো দলের প্রতি কৃতজ্ঞ।” দলে সুযোগ পাওয়া কেবল ছিল মোসাদ্দেকের একটি জয়। তবে মূল পরীক্ষা তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। পারফর্ম করার চ্যালেঞ্জ তো আছেই, সঙ্গে আছে পাহাড় সমান চাপও। জাতীয় দলে ফিরে যদি পারফর্ম করতে না পারেন, তাহলে স্রেফ ‘ঘরোয়া ক্রিকেটের বাঘ’ তকমা নিয়েই হয়তো শেষ করতে হতো ক্যারিয়ার। সেই ম্যাচে যখন তিনি ক্রিজে গেলেন, ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে দল তখন বেশ বিপদে। সেখান থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে আর উদ্ভাবনী নানা শটে দলকে নিয়ে গেছেন এমন স্কোরে, যেখান থেকে দল পেয়েছে ৮৬ রানের জয়। পেছনের প্রেক্ষাপট আর ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই পারফরম্যান্সকে নিজের ক্যারিয়ারের সেরা বললেন ৩০ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার, ‘বলা যায়… এরকম চাপের মুহূর্তে সেরা ম্যাচ। যদি আপনারা উইকেট সকাল থেকেই দেখেন, আমরা ড্রেসিং রুমেও কথা বলছিলাম, ৩০০-৩২০ রানের উইকেট ছিল। খুবই ভালো উইকেট। যখন আমাদের (পরপর) দুইটা উইকেট পড়ে যায়, আমাদের জন্য একটু কঠিন হয়ে যায়। লিটনের আউটটা যদি ওই সময়টাতে না হতো, হয়তোবা আমরা ৩০০-৩২০ করতে পারতাম।” সূত্র : বিডিনিউজ