প্রকাশ :: ... | ... | ...

বিদায়বেলায় বিশ্বকাপ ফাইনালের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে মুখ খুললেন মেসি


সংযুক্ত ছবি

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ ম্যাচটাও হয়ে গেল উৎসবের আবহে। বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারানোর রাতে গোল করেছেন তিনি, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি। কিন্তু আনন্দের সেই রাতের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে থাকল মেসির বিদায়ী বক্তব্য—যেখানে শেষ বিশ্বকাপের হতাশা, নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে প্রথমবারের মতো নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ২০২৬ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে সেই স্বপ্ন থেমে যায়। ম্যাচের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ছড়াতে থাকে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আর্জেন্টিনা দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানালেও মেসি এতদিন ছিলেন নীরব। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষ ম্যাচের পর সেই নীরবতা ভাঙলেন তিনি। বেনিনের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ শেষে মনুমেন্তালে দেওয়া বক্তব্যে মেসি বলেন, শেষ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য তারা কোনো কমতি রাখেননি। বরং সেই অভিযানে নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্যের শেষটুকুও ব্যয় করেছিলেন তারা। মেসির ভাষায়, ‘আমি চিরকাল এখানে থাকতে চাই। তবে মনে হচ্ছে বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য সত্যিই অনেক বেশি কঠিন ছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। খুব কাছাকাছি পৌঁছেও গিয়েছিলাম। সত্যি বলতে, কিছু মানুষ যেভাবে বলছেন, তেমন অস্বাভাবিক কিছুই ঘটেনি। আমরা নিজেদের সর্বস্ব দিয়েছিলাম।’ বিশ্বকাপের সেই অভিযানে একটি ম্যাচের ধকল তাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছিল বলেও জানান মেসি। তার ভাষায়, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি শারীরিক ও মানসিক—দুই দিক থেকেই আমাদের ভীষণভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। বাস্তবতা হলো, আমরা কোনোমতে সেই ধকল সামলে উঠি।’ শেষ বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেসি অবশ্য কোনো অজুহাত দাঁড় করাননি। বরং পুরো দল কীভাবে প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করেছে, সেটিই সামনে এনেছেন। তার কাছে বিশ্বকাপের সেই যাত্রা ছিল দীর্ঘদিনের একটি ধারাবাহিক সংগ্রামের অংশ। মেসি বলেন, ‘এই জার্সি গায়ে আমরা সব সময় যেভাবে লড়াই করেছি, এবারও সেভাবেই লড়েছি। যেসব সতীর্থের সঙ্গে খেলেছি, লড়াই করেছি তাদের সবাইকে নিয়েই। শুধু তাদের সঙ্গে নয়, যারা আমাদের শিরোপা জয়ের সময় দলে ছিল, তাদের সঙ্গেও লড়েছি। এর আগেও আমরা লড়াই করেছি, যদিও দুর্ভাগ্যবশত তখন চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি। আমরা খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলাম।’ তারপরই আসে মেসির সবচেয়ে দৃঢ় বক্তব্য—জাতীয় দলের হয়ে যারা মাঠে নামেন, তাদের নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার সুযোগ নেই। ‘আমার পাশে থাকা প্রত্যেক সতীর্থই এই জার্সির জন্য নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই,’ বলেন তিনি। মনুমেন্তালে মেসির বক্তব্য শুনতে শুনতে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজও। একে একে সতীর্থদের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন মেসি। যেন দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ পাতাগুলো নিজেই উল্টে দেখছিলেন তিনি। তবে বিদায়ের আবেগের মধ্যেও ভবিষ্যৎ আর্জেন্টিনা দলের জন্য ছিল তার স্পষ্ট বার্তা। বাইরের সমালোচনা, চাপ কিংবা প্রতিকূলতা—কোনোটিই যেন দলের ঐক্য নষ্ট করতে না পারে, সেটিই সতীর্থদের মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। মেসি বলেন, ‘এটা অনেকবার প্রমাণিত হয়েছে, আমরা যখন একসঙ্গে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকি, তখন যে কারও চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠি। যেকোনো বাধা অতিক্রম করার সামর্থ্যও আমাদের থাকে। সামনে নিশ্চিতভাবেই কঠিন সময় আসবে। কারণ এতদিন ধরে আমরা যা করেছি, তা স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। সেই কঠিন সময়ে আমাদের আরও বেশি করে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সমর্থন দিতে হবে।’ সতীর্থদের সঙ্গে শেষ আলোচনার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মেসি। সেখানে তার মূল বার্তা ছিল ঐক্য। বড় কোনো সাফল্য হঠাৎ আসে না—তার জন্য দরকার বিশ্বাস, পারস্পরিক আস্থা এবং একসঙ্গে লড়াই করার মানসিকতা। ‘আমি তাদের সব সময় যা বলি, আমাদের শেষ আলোচনাতেও তা-ই বলেছিলাম—বড় লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল গড়ে তুলতে হয়। কারণ এমন কিছু মানুষ আছে, যারা জাতীয় দলকে ব্যর্থ হতে দেখতে চায়। আমরা তাদের সন্তুষ্ট করতে পারি না,’ বলেন মেসি। তারপরই যোগ করেন, ‘কঠিন ও প্রতিকূল সময়েই একটি দলের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায়। দলের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য না থাকলে সাফল্য অর্জন করা খুব কঠিন। আর আমি আপনাদের বলছি, আমরা ছিলাম অসাধারণ একটি দল। সে কারণেই এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি।’ আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির শেষ রাত তাই শুধু একটি ম্যাচের সমাপ্তি নয়; ছিল তার দীর্ঘ আর্জেন্টিনা অধ্যায়েরও পর্দা নামার মুহূর্ত। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা—অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। মাঝখানে ছিল ব্যর্থতা, সমালোচনা, কান্না ও অবিশ্বাসের সময়ও। সবশেষে সেই গল্পের দিকে ফিরে তাকিয়ে মেসির বক্তব্যের সারকথা যেন একটাই—সবকিছুর পরও তারা লড়াই করেছেন, একসঙ্গে ছিলেন এবং নিজেদের সেরাটাই দিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব কিংবা বাইরের কথার চেয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সতীর্থদের প্রতি বিশ্বাস এবং আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি দায়বদ্ধতা। বিদায়ের রাতে তাই মেসি শুধু অতীতের ব্যাখ্যা দেননি; রেখে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বার্তা—আর্জেন্টিনার শক্তি তার তারকায় নয়, তার ঐক্যে।