বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) সর্বশেষ দ্বাদশ আসর ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক এক পরিচালকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধির বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের সাময়িকভাবে বরখাস্তও করা হয়েছে। অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য প্রত্যেককে ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিসিবি বিস্তারিত তথ্যের সঙ্গে জানিয়েছে অভিযুক্ত তিনজন হলেন—বিসিবির সাবেক পরিচালক ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মুখলেসুর রহমান (শামীম), বিসিবির সাবেক সিকিউরিটি লিয়াজোঁ অফিসার (এসএলও) জাকির হোসেন এবং বগুড়া জেলার সাবেক বিসিবি কাউন্সিলর ও অডিট কমিটির সাবেক সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলাম সানি। বিসিবি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের তদন্তের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তটি বিপিএল টি-টোয়েন্টির দ্বাদশ আসরকে কেন্দ্র করে কথিত দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য গোপন, তদন্তে অসহযোগিতা এবং তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ নিয়ে পরিচালিত হয়েছে। মুখলেসুর রহমানের বিরুদ্ধে আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধির ২.১.১ ধারায় ম্যাচের ফল, অগ্রগতি, আচরণ বা অন্য কোনো দিক অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা বা এ ধরনের প্রচেষ্টায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ২.১.৪ ধারায় কোনো অংশগ্রহণকারীকে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত, প্ররোচিত বা সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ২.৪.৪ ধারায় দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কোনো প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ পাওয়ার তথ্য নির্ধারিত দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তাকে যথাসময়ে জানাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। ২.৪.৭ ধারায় তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ বা তথ্য গোপন, মুছে ফেলা কিংবা নষ্ট করে তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ২.১.১ ও ২.১.৪ ধারার পাশাপাশি ২.৪.৬ ধারায় দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে তদন্তকারী নির্ধারিত দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তার জারি করা ডিমান্ড নোটিশ মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। অন্যদিকে রাকিবুল ইসলাম সানির বিরুদ্ধে ২.৪.৪ ধারায় দুর্নীতির প্রস্তাব বা আমন্ত্রণের তথ্য যথাসময়ে প্রকাশ না করার এবং ২.৪.৬ ধারায় তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিসিবি জানিয়েছে, অভিযুক্ত তিনজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগের নোটিশ পাওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে তাঁদের জবাব দিতে হবে। এরপর আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী আচরণবিধি অনুযায়ী শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। এর আগে দ্বাদশ বিপিএল ঘিরে বিসিবির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে আরও চারজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও এর আগে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চিটাগং রয়্যালসের লজিস্টিক ম্যানেজার মো. লাবলুর রহমান, নোয়াখালী এক্সপ্রেসের সহমালিক মো. তৌহিদুল হক, ক্রিকেটার অমিত মজুমদার এবং সিলেট টাইটানসের টিম ম্যানেজার রেজওয়ান কবির সিদ্দিকী। তাঁদের বিরুদ্ধেও কথিত বেটিং-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড, দুর্নীতিমূলক যোগাযোগ, আইসিসির আচরণবিধির ৪.৩ ধারার অধীনে জারি করা ডিমান্ড নোটিশ মেনে চলতে ব্যর্থতা, তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য বা যোগাযোগ গোপন বা মুছে ফেলা এবং দুর্নীতিবিরোধী তদন্তে অসহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদেরও অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সর্বশেষ বিপিএলকে ঘিরে বিসিবির দুর্নীতিবিরোধী তদন্তে খেলোয়াড় থেকে শুরু করে দলীয় কর্মকর্তা, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকপক্ষ এবং বিসিবির সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের বিষয় সামনে এসেছে। দ্বাদশ বিপিএলকে ঘিরে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি একাধিক বিপিএল আসরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের তদন্ত শেষে চিটাগং রয়্যালসের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সামিনুর রহমানকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করেছে বিসিবি। বিসিবির ‘এক্সক্লুডেড পারসন পলিসি’র আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বিপিএলে সামিনুর চিটাগং রয়্যালসের সিইও ছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি শুধু দ্বাদশ আসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিপিএলের নবম, দশম ও একাদশ আসরসহ একাধিক আসরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডও তদন্তের আওতায় ছিল। আগের বিপিএলের ফিক্সিং অভিযোগের তদন্তও হয়েছিল বিপিএলে দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। একাদশ বিপিএল ঘিরে ম্যাচ ফিক্সিংসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর বিসিবি একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটি অভিযোগগুলো তদন্ত করে গত বছরের অক্টোবরে বিসিবির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সর্বশেষ দ্বাদশ আসর ঘিরে বিসিবির ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের তদন্ত এবং একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার ঘটনা সেই ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে অভিযোগ আনা বা সাময়িক বরখাস্ত করার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। আইসিসির আচরণবিধি অনুযায়ী তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব পাওয়ার পর পরবর্তী প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হবে। বিসিবি বলেছে, এ পর্যায়ে এসব বিষয়ে তারা আর কোনো মন্তব্য করবে না।